‘বাবা নামক মানুষটি কেমন’ জানবে না ইসকনের হামলায় নিহত সাইফুলের অনাগত সন্তান
তাসকিয়া নামে তিন বছরের এক কন্যা সন্তানের জনক সাইফুল ইসলাম আলিফ। স্ত্রী ইসরাত জাহান তারিন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার হওয়ার কথা ছিল সাইফুল দম্পতির। হয়তো সেই স্বপ্নই বুনছিলেন তারা। কিন্তু এর মধ্যেই বাসা বেঁধে বসা এক দুঃস্বপ্ন কেড়ে নিল সাইফুলের জীবন।
পৃথিবীটা বুঝে উঠার আগেই বাবাকে হারালো ছোট্ট তাসকিয়া। বাবা নামক মানুষটির আদর বঞ্চিত হলো অনাগত সন্তানও।
মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি এলাকায় ইসকন সমর্থকদের হামলায় নিহত হন তরুণ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ। এ ঘটনায় আহত হন আরো কয়েকজন।
.png)
নিহত সাইফুল চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার জামাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি ২০১৮ সালে জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। পরে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধন পান। সম্প্রতি তিনি চট্টগ্রাম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান।
জানা গেছে, সাত ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ সাইফুল। ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে হাসপাতালে ছুটে আসেন বড় বোন জান্নাত আরা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আসরের সময় খবর দিয়েছে একজন সাইফুলের যেন কি হয়েছে। আমার মেয়েটা মেডিকেলে পড়ে। আমি ওকে ফোন দিয়ে বলি যে— তোমার মামার কি হইছে একটু দেখতে যাও তো। পরে মেয়ে আমাকে বলে যে- মা, মামা তো আর নেই। হাসপাতালে ছুটে এসে দেখি আমার আদরের ভাইটা আর নেই।
তিনি আরো বলেন, ওর তিন বছরের একটা মেয়ে আছে। আরেকটা সামনে হবে। ওর বউ চার মাসের গর্ভবতী। ও এখানে একা থাকতো। এই বাচ্চা মেয়েটার কি হবে। আমার পরিবার তো শেষ হয়ে গেল। কারা মারলো আমার ভাইকে। আমরা এর বিচার চাই।
এদিন দুপুরে জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগে রাষ্টদ্রোহ মামলায় ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। এরপরই আদালত এলাকায় তাণ্ডব চালান ইসকন সমর্থকরা।
এর আগে তারা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে বহনকারী পুলিশের প্রিজন ভ্যানটি আড়াই ঘণ্টা আদালত চত্বরে আটকে রাখেন। পরে আদালতের কেন্দ্রীয় মসজিদে হামলা এবং আইনজীবী ও সাংবাদিকদের প্রাইভেটকার-মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন। তাদের হামলায় আহত হন আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফসহ কয়েকজন। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক সাইফুলকে মৃত ঘোষণা করেন।
সোমবার (২৫ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার নিউমার্কেট মোড়ের স্বাধীনতা স্তম্ভে জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগে হওয়া মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হয়।
গত ৫ আগস্টের পর দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীর নামে কয়েক দফা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেসব সমাবেশ থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বর্তমান সরকারের উদ্দেশে নানা ধরনের হুমকি-ধামকিমূলক বক্তব্য রাখেন। এর আগে থেকে তিনি আলোচনায় থাকলেও গত ২৫ অক্টোবর বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি মাঠে ৮ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সমাবেশে বেশি আলোচনায় আসেন।
ঐ সমাবেশ করা হয় বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের নামে। সমাবেশে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসই বাংলাদেশের হিন্দুদের মঠ-মন্দিরে হামলা বাড়িঘরে লুট, অগ্নিসংযোগসহ নানা অভিযোগ করেন। অথচ তার বিরুদ্ধেই দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় তিনি উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
গত ৩০ অক্টোবর সনাতন ধর্মবিশ্বাসী সংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রীকৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) আলোচিত সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে এ মামলা দায়ের হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা হলেন- রাজেশ চৌধুরী ও হৃদয় দাশ। মোহাম্মদ ফিরোজ খান নামে একজন বাদী হয়ে নগরের কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করেন। মামলায় অজ্ঞাত পরিচয়ের আরো ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, গত ৫ অগস্ট গণঅভুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা নিউমার্কেট মোড়ে একটি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। গত ২৫ অক্টোবর লালদিঘী মোড়েসমাবেশের দিন ঐ পতাকার ওপর সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় গোষ্ঠী ইসকনের গেরুয়া রঙের ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করে স্থাপন করে দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে অস্বীকার করার সামিল।
এজাহারে আরো বলা হয়, জাতীয় পতাকার ওপর ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করে আসামিরা দেশের ভেতর অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশকে অকার্যকর করার রাষ্ট্রদোহ কাজে লিপ্ত আছে।