কোম্পানিতে নিম্নমানের সাদা ডলোচুন ও গাম আঠা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে নানা রকম জিংক। গাম আঠার সঙ্গে সুগন্ধি রং মিশিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে নানা রকম হরমোন। এছাড়াও নদীর বালি দিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্বোফুরান গ্রুপের কীটনাশক। আর ভেজাল ও নিম্নমানের এসব উপকরণ প্রস্তুত ও বাজারজাত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতারকরা।
এতে প্রধান সবজি চাষ ও অন্যতম লিচু চাষ অঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশকসহ উপকরণ উৎপাদনের বিষয়ে কিছুই জানেন না কৃষি অফিস ও খামারবাড়ি।
.png)
তবে উৎপাদনকারী প্রতারকদের দাবি, স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মাসোয়ারা চুক্তিতে ম্যানেজ করেই দাপটের সঙ্গে এসব ভেজাল কীটনাশক তৈরি ও বিক্রি করে কৃষকদের সঙ্গে করা হচ্ছে এক অভিনব প্রতারণা।
গত এক সপ্তাহ ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর শেখেরদাইড় গ্রামের আফছার আলী প্রামানিকের ছেলে তরিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় গোপনে এসব ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশক প্রস্তুত করে আসছেন। কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, ফার্টিলাইজার সার ও তরলের প্রায় ৫০ রকম ভেজাল বালাইনাশক তৈরি করা হচ্ছে এ ভুয়া কারাখানায়। ভেজাল ও নিম্নমানের সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রস্তুতকারক তরিকুল ইসলাম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ চক্র তৈরি করে দীর্ঘদিন যাবত এসব কৃষিপণ্য বাজারজাত করে আসছেন বলে জানিয়েছেন একটি সূত্র। দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে তরিকুলের উৎপাদিত এসব ভেজাল ও নিম্নমানের কৃষিপণ্য বেশি সরবরাহ করা হয়। বেশি লাভের আশায় এক শ্রেণির দোকানদাররা কৌশলে বাজারের অন্যান্য মান সম্পন্ন কৃষিপণ্যের সঙ্গে এসব ভেজাল ও নিম্নমানের কৃষি পণ্যগুলো বিক্রয় করে থাকেন। গত কয়েক বছর ধরেই বাগেরহাট, যশোর, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বেশ কিছু জেলা ও উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও কীটনাশক বিক্রেতাদের অভিযোগে কৃষি বিভাগ থেকে এসব পণ্য জব্দ করা হচ্ছে। প্রস্তুত ও বাজারজাত করতে নিষেধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণ।
লিচু উৎপাদিত এলাকা সলিমপুর, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি, সাহাপুর, পাকশীর একাধিক লিচু চাষিরা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় কিছু অসাধু বিক্রেতারা এসব ভেজাল ও মানহীন সার-বিষ, কীটনাশক কৃষি পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানির মালিকের সঙ্গে যোগসাজসে প্রতিবছরই তাদের নিকট নাম পরিবর্তন করে এসব পণ্য বিক্রয় করছেন। এতে লিচুর পোকা, ছত্রাকজনিত পচন রোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন লিচু চাষিরা। ভেজাল কৃষি পণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত কারণে কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না।
বেশ কয়েকজন সার, বিষ ও কীটনাশক দোকানের বিক্রেতা কৃষকের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সবাই ভেজাল ও নিম্নমানের কৃষি পণ্য বিক্রয় করেন না। আবার সেগুলো যে নিম্নমানের তাও প্রাথমিকভাবে বোঝা যায় না। প্রয়োগের পর ওষুধে কাজ না হওয়ায় কৃষকরা যখন এসে অভিযোগ করেন তখনই বোঝা যায় পণ্যটি ভেজাল ও মানহীন। এতে দোকানদারদেরও ব্যবসায়ীক সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিত।
কৃষক ও সার বিষ এবং কীটনাশক বিক্রেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, মাদারল্যান্ড এগ্রি কেয়ার ইমপোর্ট এন্ড এক্সপোর্ট লিমিটেড, মাদার ক্রপ কেয়ার, মাদারল্যান্ড এগ্রো বিসনেস নামে কয়েকটি কোম্পানির নামে এসব কীটনাশক প্রস্তুত হচ্ছে। আর এই কোম্পানির ঠিকানা অনুসারে প্রতিষ্ঠানটির কর্পোরেট অফিস ২১৩/৩ মশুড়িয়াপাড়া, পাতিলাখালি রোড, ঈশ্বরদী। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সেটি তাদের ভাড়া নেয়া বসতবাড়ি।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এখানে কেউ আসেন না। অফিসের কোনো কার্যক্রম চলতে দেখা যায় না। নামমাত্র সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। এদিকে কোম্পানিগুলোর হেড অফিস হাশেম ম্যানসন (৪র্থ তলা), ৪৮, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, এই ঢাকা ঠিকানাটাও একটি বাড়ির। সেখানেও কোনো কার্যক্রম নেই বলে জানা গেছে। আবার বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী পাবনাতেও এসব নামে কোনো কোম্পানির প্লট নেই। তবে সেখানকার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঈশ্বরদীর সলিমপুর ইউনিয়নের তরিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বিগত কয়েক বছর আগে বিসিকের একটি বন্ধ কারখানা ভাড়া নিয়ে সেখানে ভেজাল, মানহীন কীটনাশক, সার ও বিষ উৎপাদন করতেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সেটি বন্ধ করে চলে গেছেন তরিকুল। এখন ঈশ্বরদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে ভেজাল, মানহীন এসব কৃষিপণ্য উৎপাদন করে বিভিন্ন নামে বাজারজাত করে আসছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) পাবনার ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (স্ট্রেট অফিসার) মো. মোস্তফা কামাল বলেন, এসব নামে এখানে কোনো কোম্পানি নেই। তাদের নামে কোনো প্লটও নেই।
একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী দাশুড়িয়া ইউনিয়নের আথাইল শিমুল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মেসার্স আল-বারী রাইচ মিলের গোডাউনে এসব ভেজাল, মানহীন বালাইনাশক কীটনাশক প্রস্তুত করা হচ্ছে। ভিতরে কী হচ্ছে তা বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর দুপুরে খাবারের সময় বের হন কয়েকজন নারী শ্রমিক। তখন গোডাউনের ভিতরে প্রবেশ করে মহাকর্মযজ্ঞ দেখা যায়। সেখানে ৮-১০ জন নারী, একজন পুরুষ ও একজন ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিশু ছাত্র দৈনিক ২৩০ টাকা দিন হাজিরায় কাজ করছে।
কেউ সাদা ডলোচুনের সঙ্গে গাম আঠা মিশিয়ে জিংক বালাইনাশক প্রস্তুত করে প্যাকেটে ভরছেন। কেউ ডামে রাখা গাম আঠার সঙ্গে সুগন্ধি রং মিশিয়ে হরমোন প্রস্তুত করে বোতলজাত করছেন। কেউ নদীর বালু দিয়ে কার্বোফুরান গ্রুপের দানাদার কীটনাশক প্রস্তুত করে প্যাকেটজাত করছেন। তবে তারা কী প্রস্তুত করছেন তা তাদেরও জানা নেই।
এভাবে কী প্রস্তুত করছেন তা জানতে চাইলে শ্রমিকরা বলেন, সেটা আমরা জানি না। ফ্যাক্টরির ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম ও মালিক মো. তরিকুল ইসলাম যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন সেভাবে আমরা শুধু কাজ করি।
এরমধ্যে শ্রমিকদের নিকট থেকে খবর পেয়ে ফ্যাক্টরিতে ছুটে আসেন ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বিনা অনুমতিতে কেন ভিতরে প্রবেশ করেছেন বলে জানতে চেয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। তবে কেন এতো গোপনে এসব বালাইনাশক তৈরি করা হচ্ছে সে বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্ত্রী শাহানাজ পারভীন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আছেন মো. তরিকুল ইসলাম। তরিকুল ইসলামের বাবা মো. আফসার আলী প্রামানিকের নামে আফসার কর্পোরেশনের নামে কিছু পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা সম্ভব হয়নি
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার বলেন, আমাদের কৃষি অফিস থেকে মাদারল্যান্ড ক্রপকেয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া আছে। তবে অন্য কোম্পানির কোনো অনুমোদন দেওয়া নেই। এর আগে শুনেছিলাম মো. তরিকুল ইসলাম পাবনা বিসিকে কারখানা দিয়ে সার, কীটনাশক প্রস্তুত করে বাজারজাত করেন। খুব শিগগিরই কোম্পানিগুলোর ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে প্রেরণ করা হবে।
কৃষি অফিসে মাসোয়ারা দিয়ে এসব ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে বলে কোম্পানির স্বত্বাধিকারীদের দাবিটি সরাসরি অস্বীকার করে কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার বলেন, কৃষকের ক্ষতিকারীদের সঙ্গে কোনো আপোষ নেই।