মিঠাপানির বিষমুক্ত এ সুস্বাদু শুঁটকি দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্তত ২০ দেশে রফতানি হচ্ছে। সুষ্ঠু সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে অনেক শুঁটকি নষ্ট হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভৌগোলিক কারণেই এ অঞ্চলে ব্যাপক হারে মৎস্যজীবীদের বসতি গড়ে উঠেছে। তারা সারা বছর এসব এলাকার জলাশয় বা পুকুর থেকে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ অঞ্চলের বড় বড় জলাশয়ের ধারে গড়ে উঠেছে শুঁটকি তৈরির চাতাল।
.png)
ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকে শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চলে শুঁটকি প্রক্রিয়ার কাজ। সকাল থেকে রাত অবধি মাছ কেনা, ধোয়া, চাতালে শুকানো ও বাছাই করে পৃথক করার কাজ চলে চাতালে। এলাকার শত-শত নারী ও পুরুষ শ্রমিক এ কাজের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বিলগুলোতে উৎপাদিত মাছ থেকে চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর পাবনায় ১৫৬ টন শুঁটকির উৎপাদন হয়েছিল। উৎপাদিত শুঁটকির বেশির ভাগই ভারতে রফতানি হয়েছে। এবার ১৬০ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
জেলায় সবচেয়ে বেশি শুঁটকি উৎপাদন হয় সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায়। এসব উপজেলায় চলনবিল, গাজনার বিলসহ ছোট-বড় বেশ কটি বিল রয়েছে। এসব বিলের মাছ অত্যন্ত সুস্বাদু। এ কারণে ভারতে পাবনার শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাবনার মানুষ শুঁটকি খেতে তেমন পছন্দ করেন না, তাই জেলায় উৎপাদিত শুঁটকির ৯০ ভাগের বেশি ভারতসহ কয়েকটি দেশে রফতানি হয়।
শুঁটকি রফতানি সামনে রেখে জেলায় শুঁটকির উৎপাদন বাড়ছে। চলতি বছর চলনবিল ও গাজনা বিল পাড়ে গড়ে উঠেছে তিন শতাধিক অস্থায়ী শুঁটকির চাতাল।
চাটমোহর উপজেলার চলনবিল এলাকার বোয়াইলমারী ব্রিজ সংলগ্ন চাতাল, সুজানগরে গাজনা বিলপাড়ে চরদুলাই, সাঁথিয়ার সাতানীর চর, আরাজী গোপিনাথপুর, হুইখালী,কলাগাছি, রঘুনাথপুর জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা মাছ কেনা বা শুকানোর কাজ করে। বেড়ার জয়নগর, হরিরামপুর, কৈতলা; সাঁথিয়ার পারকরমজা, পুণ্ডুরিয়া, শামুকজানি, ঘুঘুদহ, বড়গ্রামসহ সাত-আটটি শুঁটকিখোলা ঘুরে ব্যাপক কর্মব্যস্ততা দেখা গেছে।
একেকটি চাতালে গড়ে ১০ জন নারী-পুরুষ কাজ করেন। সে হিসেবে প্রায় ৩ হাজার পরিবারের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়েছে এভাবে। নারী-পুরুষ সদস্যরা দিন হাজিরায় কাজ করছেন শুঁটকি চাতালে। তবে সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই নারী।
স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিলের পানি কমতে থাকলে চলনবিলের ও গাজনা বিলের বিভিন্ন স্থানে জেলেদের জালে ধরা পড়ে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, কই, মাগুর, শিং, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, শোল, গজারসহ নানা জাতের মাছ।
ঘুরে দেখা গেছে, শুঁটকি খোলায় পুঁটি, চাঁদা, টাকি, শোল, বোয়াল, চাপিলা, কাকিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকানো হচ্ছে।
খোলার মালিকেরা জানান, পুঁটি ও শোল মাছ সবচেয়ে বেশি শুঁটকি করা হয়। স্থানীয় জেলে অথবা মাছের আড়ত থেকে প্রতি কেজি পুঁটি মাছ ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় এবং শোল মাছ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় কেনা হয়। শুঁটকি করার পর পুঁটি শুঁটকি আকারভেদে ২০০ থেকে ৬০০ টাকায় এবং শোল শুঁটকি এক থেকে দেড় হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
উৎপাদিত বেশির ভাগ শুঁটকিই পাঠানো হয় সৈয়দপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সেখান থেকে যায় বিদেশে।
শুঁটকি ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাবনার শুঁটকির মান বেশ ভালো। এর মধ্যে ভারতে রয়েছে পুঁটি শুঁটকির ভালো চাহিদা। তা ছাড়া আমরা মালয়েশিয়াতেও শুঁটকি পাঠাই।
সাঁথিয়ার শুঁটকি ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি চাতাল থেকে পছন্দের শুঁটকি মাছ কিনে নিয়ে যায়। ‘এ’ গ্রেডের (ভাল মানের) শুঁটকি মাছ যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্তত ২০টি দেশে রফতানি হয়। এাছাড়া ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ দেশের ভেতরে দিনাজপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও চট্রগ্রামে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়ে থাকে।
শুঁটকি খোলার মালিক সাইফুল ইসলাম ও জহুরুল ইসলাম জানান, আট বছর ধরে তারা শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিন-চার মাসে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দামের সাত-আট টন শুঁটকি উৎপাদিত হবে বলে তারা আশা করছেন। গত বছর এই শুঁটকিখোলা থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। এবার আরো বেশি লাভের আশা করছেন তারা।
চলনবিল পাড়ের শুঁটকি ব্যবসায়ী রফিক সর্দার জানান, চলনবিলের মাছ প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে শুঁটকি তৈরি করে সৈয়দপুর, রংপুর, তিস্তার আড়তদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এখনো চলনবিল এলাকায় বাজার সৃষ্টি হয়নি।
আরেক ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জানান, এ ব্যবসায়ে ঝুঁকিও অনেক বেশি। ঠিকমতো শুঁটকির পরিচর্যা করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে শুঁটকি নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে টানা বৃষ্টিতে শুঁটকি নিয়ে বিপদে পড়তে হয়। আকাশ মেঘলা থাকলে অনেক মাছ রোদের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, উৎপাদিত শুঁটকি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর এই অঞ্চলে লাখ লাখ টাকার শুঁটকি মাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে বর্ষার সময়ে নিষিদ্ধ চায়না জালে মাছ শিকারের কারণে রেণু পোনা থেকে শুরু করে সকল প্রকারের দেশি মাছের সংকট দেখা দিয়েছে খাল-বিল ও জলাশয়গুলোতে।
তারা জানান, সুষ্ঠু সংরক্ষণ করা গেলে বছরের অন্যান্য সময়ও ভোক্তারা কম দামে শুঁটকি মাছ পেতো। তারা চলনবিল ও গাজনা বিলপাড়ে শুঁটকি সংরক্ষণাগার স্থাপনের দাবি জানান।
জয়নগর গ্রামের শুঁটকি খোলায় কর্মরত শাহানা খাতুন ও রোয়া খাতুন জানান, পাশেই তাদের বাড়ি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শুঁটকি খোলায় কাজ করে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে আয় হয়। এই আয় থেকে কেউ সঞ্চয় করছেন, কেউবা সংসারের নানা জিনিস কিনছেন।
পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, চলনবিল ও গাজনা বিলসহ পাবনার অন্যান্য বিলের শুঁটকি কোনো রকম রাসায়নিকের প্রয়োগ ছাড়াই প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে এ শুঁটকি স্বাস্থ্যসম্মত। চাষিদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক উপায়ে শুঁটকি তৈরি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।