ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

৩ ঘণ্টায় যেখানে বিক্রি হয় ৪০ লাখ টাকার মাছ

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশিত: ১৬:১৩, ২১ ডিসেম্বর ২০২৪
৩ ঘণ্টায় যেখানে বিক্রি হয় ৪০ লাখ টাকার মাছ
ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক-ডাকে মুখরিত বাজারের চারপাশ -ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের বড় বাজার হলো একটি অতি পুরাতন বাজার। এই বাজারে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় মাছ বেচাকেনার কর্মযজ্ঞ। মাছ বিক্রিকে কেন্দ্র করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক-ডাকে মুখরিত হয়ে উঠে বাজারের চারপাশ। খাতা-কলম হাতে নিয়ে হিসাব কষতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন আড়তদাররা। পছন্দের মাছ ক্রয়ে চলে একপ্রকার দর-কষাকষিও। সর্বোচ্চ দরদাতার হাতে যায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বাজারে মাত্র ৩ ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে ৪শ’ মণ মাছ বিক্রি হয়। যার বাজার মূল্য ৪০ লাখ টাকার উপর।

একাধিক মৎস্য আড়তদার জানান, এই প্রাচীন বাজারের সুনাম রয়েছে সুদীর্ঘ বছরের। রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় প্রতিদিন শতশত মৎস্য চাষি, বেপারী, ব্যবসায়ী এখানে মাছ বিকিকিনি করছেন। বড় বড় মাছের জন্য এ বাজারের খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বাজারে প্রায় ২০টি মৎস্য আড়ত রয়েছে। ভোররাত থেকেই মৎস্য চাষিরা ছোট-বড় যানবাহনে করে তরতাজা নানা প্রজাতির মাছ বিক্রির জন্য এখানে নিয়ে আসেন। ওসব মাছের মধ্যে রুই, কাতল, মৃগেল, পাঙ্গাস, পু‍ঁটি, সরপুঁটি, কার্প, তেলাপিয়া, বোয়াল, গ্রাস কার্প, নাইলোটিকা, শিং, মাগুর, কৈসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। তাছাড়া মাছ ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব, নরসিংদী, ঢাকা, কুমিল্লা, লাকসাম, ফেনী, চট্রগ্রাম, মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক লোকজন এখানে আসছেন। ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। এরপর পাইকাররা মাছ ক্রয় করে ট্রেন ও পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে নিয়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ গন্ত্যব্যে।

Advertisement

একাধিক মৎস্য চাষি জানান, পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতশত মানুষ বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছেন। চাষকৃত বেশিরভাগ মাছ তারা আড়তে এনে বিক্রি করছেন।

কুমিল্লা থেকে আসা পাইকার মো. হিরন মিয়া বলেন, প্রতিদিন ভোরে এই বাজার থেকে নানা প্রজাতির অন্তত ১২-১৫ মণ মাছ ক্রয় করছি। এরপর ওসব মাছ পিকআপে করে বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয়। এখানে অন্যান্য জায়গার চেয়ে দর ও চাহিদানুযায়ী মাছ ভালো পাওয়া যায়। স্থানীয় বাজারে মাছের কদর ভালো হওয়ায় বিক্রিতে বেশ লাভ হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছ ব্যবসায়ী মো. আজিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মাছ ব্যবসা করছি। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় এই বাজার থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির ১২-১৫ মণ মাছ ক্রয় করে নিজ এলাকায় বিক্রি করছি।

তিনি আরো বলেন, সবসময় মাছের দর এক থাকে না। প্রতিদিন রুই, কাতল, মৃগেল, কার্প জাতীয় ১৫ মণের উপর মাছ কেনা হয়। মাছগুলো পিকআপে করে নিয়ে যাব। এরপর নিজ এলাকার বাজারে বসে বিক্রি করব। মাছের কদর ভালো থাকায় দুপুরের মধ্যে মাছ বিক্রি শেষ হয়।

মৎস্য চাষি ফরিদ মিয়া বলেন, লাভজনক হওয়ায় ৭ বছর ধরে মাছ চাষ করছি। বর্তমানে বার্ষিক ইজারাসহ আমার ৮টি পুকুর রয়েছে। এই বাজারে এক সপ্তাহ পরপর গড়ে ২০-২৫ মণ মাছ বিক্রি করছি। অনেক সময় ভালো দামের আশায় বিভিন্ন বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে মাছের দর ভালো থাকায় বিক্রিতে তিনি খুবই খুশি।

মৎস্য চাষি আব্দুল আলিম মিয়া বলেন, বার্ষিক ইজারায় নেয়া আমার ৫টি পুকুর রয়েছে। ওসব পুকুরে রুই, কাতল, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা রয়েছে। গত ৫ মাস ধরে মাছ বিক্রি করছি। তবে মাছের খাবারের দাম কম থাকলে ভালো টাকা আয় করা যেতো। এখন বাজারে মাছের দর ভালো পাওয়া গেলেও খাবারসহ অন্যান্য খরচ বেশি হচ্ছে।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী লোকমান মিয়া জানায়, প্রতিদিন ভোরে রুই কাতলসহ ছোট আকৃতির ৩ থেকে ৪ মণ মাছ ক্রয় করে এরপর বাজারে বসে খুচরা বিক্রি করছি। মাছের চাহিদা ভালো থাকায় দুপুরের আগেই বিক্রি শেষ হয়।

মাছ ব্যবসায়ী মো. শামীম মিয়া বলেন, আড়ত থেকে মাছ ক্রয় করে বাইসাইকেল দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এ ব্যবসা করছি। ভোরে মাছ কেনার জন্য আলাদা চিন্তা থাকে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম হয় না। কারণ, কখন যে সকাল হয়ে যায়, সেই চিন্তা কাজ করে।

তিনি আরো বলেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরে মাছ বিক্রি কষ্ট হলেও এতে ভালো টাকা আয় হয়।

পৌর শহরের বড় বাজার মৎস্য আড়ত সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সেন্টু মিয়া জানান, বড় বাজার হলো প্রাচীন বাজার। স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গার মৎস্য চাষিরা তাদের উৎপাদিত মাছ বিক্রি করতে এখানে নিয়ে আসেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় বিভিন্ন জায়গার লোকজন এখান থেকে মাছ ক্রয় করেন। তাছাড়া বিয়ে-শাদি, জন্মদিন, অন্যান্য অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নের জন্য মাছ কিনতে আসেন। এখানে তুলনামূলকভাবে অন্যসব বাজারের চেয়ে কম দামে মাছ বিক্রি হয়।

বড় বাজার মৎস্য আড়ত সমিতির সভাপতি ও কল্লা শহীদ মৎস্য আড়তের মালিক মো. হানিফ মিয়া বলেন, এই বাজারে স্থানীয়দের পাশ‍াপাশি বিভিন্ন জায়গার লোকজন মাছ নিয়ে আসছেন বিক্রি করতে। দৈনিক গড়ে ৪শ’ মণের উপর মাছ বিক্রি হয়। যার বাজার মূল্য ৪০ লাখ টাকার উপর। তবে আমার আড়তে দৈনিক গড়ে ৬০-৭০ মণ মাছ বিক্রি হয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসে মাছ ক্রয় করে নিয়ে যান। তাছাড়া এখানকার মাছ ভারতে রফতানি হচ্ছে।

আখাউড়া উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, এ উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটে চলছে। মৎস্য চাষে এলাকার শতশত যুবকদের যেমন বেকারত্ব দূর হয়েছে, পাশাপাশি শতশত লোকের কর্ম সৃষ্টি হয়েছে। বড় বাজার মৎস্য আড়তে দৈনিক গড়ে ৪০ লাখ টাকার মতো মাছ বিক্রি হচ্ছে। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে চাষিদের সবসময় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএইচ
ট্যাগ: আখাউড়া মাছ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!