ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

জামালপুরে রাস্তার ইট চুরির ঘটনায় তোলপাড়

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর
প্রকাশিত: ১৬:১৮, ১৫ জুলাই ২০২৬
জামালপুরে রাস্তার ইট চুরির ঘটনায় তোলপাড়
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামের সড়ক থেকে ইট চুরির ঘটনায় পুরো জেলাসহ প্রশাসনের মাঝে তোলপাড় চলছে। তবে চুরি যাওয়া ইট উদ্ধারসহ প্রতারকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। 

চুরি হবার পর থেকে ওই রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে কাঁদা মাড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে।

এ ঘটনায় সড়কের দায়িত্বে থাকা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বিষয়টি ফেসবুকের মাধ্যমে দেখেছেন। এছাড়াও উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সড়কের উন্নয়নকাজের কোনো দরপত্র হয়নি। 

Advertisement

স্থানীয়দের দাবি, এ রাস্তা থেকে কত হাজার ইট চুরি হয়েছে, ইটগুলো কোথায় গেল, ইটের মূল্যই বা কত? প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনই বা আইনী ব্যবস্থা নেয়া হলো না বিষয়টি রহস্যজনক মনে করছেন তারা।

জানা গেছে, ১২ মে জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামের ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার পুরোনো ইটের রাস্তা পাকাকরণ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ১২ মে এ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন, দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে কাজের উদ্বোধন করেন। 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে উন্নয়নকাজ ‘শুরু’ করা হয়। পরদিন থেকেই একে একে রাস্তার পুরনো সব ইট তুলে ফেলা হয়। 
স্থানীয়রা বলছেন সংসদ সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সড়কের কাজের উদ্বোধন করায় ইট খুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো সন্দেহ হয়নি। তবে উদ্বোধনের পর আর কাজ এগোয়নি। কথিত ঠিকাদার ও তার লোকজনকেও এলাকায় দেখা যায়নি। পরে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন, পাকা রাস্তা নির্মাণের নামে আয়োজনটি ছিল সাজানো; উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো রাস্তার ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়া। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো সড়কের সব ইট উধাও হয়ে যায়। এরপর আর কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এরই মধ্যে বৃষ্টিতে কাদায় তলিয়ে যাওয়া সেই সড়ক এখন এলাকাবাসীর চরম দুর্ভোগের পড়লে বিষয়টি পুরোপুরিভাবে ফাঁস হয়ে যায়।

গজারিআটা গ্রামের সবুজ মিয়া বলেন, এই রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করাই কষ্টকর। বর্ষা থাকায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। কোথায় কোথায় রাস্তা চেনারও উপায় নেই। অথচ কয়েক মাস আগেও এখানে ইটের রাস্তা ছিলো। এখন কাঁদাপানিতে প্রতিদিনই দুর্ভোগ হচ্ছে। ধানের বস্তা বোঝাই সাইকেল কাঁদার মধ্যে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিছু দূর পরপরই সাইকেলের চাকা কাঁদায় আটকে যাচ্ছিলো। হাঁপাতে হাঁপাতে এভাবেই সে এ রাস্তার কথা বর্ণনা করনে।

অপরদিকে এ ঘটনার পর একই কৌশলে জামালপুর সদর উপজেলার চাঁদপুর এলাকায় ১৬ জুন আরেকটি সড়কের ইট সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় চক্রটি। আগের মতো স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে সড়কের উন্নয়নকাজের উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। এরপর সেখানেও পুরোনো ইট খুলে নেওয়ার কাজ শুরু করেন মান্নান ও তার লোকজন। 

এর মধ্যে গজারিআটা গ্রামের খবর চাঁদপুর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী মান্নানের কাছে প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু তিনি কোনো বৈধ নথি দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মান্নান ও তাঁর  লোকজনকে ধরে পুলিশে দেন। গ্রেপ্তারকৃত চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান (৫০)। 

তিনি সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আমেছ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন। ওই ঘটনার কয়েক দিন আগে এলাকায় ফিরে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি একজন প্রতারক বলে জানিয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি তিনি জামিনে কারামুক্ত হয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।

জামালপুরের নারায়ণপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক মো. মঞ্জুরুল খান বলেন, গজারিআটা গ্রামের ঘটনায় মামলা হয়নি। তবে একই কায়দায় চাঁদপুর এলাকায় ইট ওঠানোর সময় চক্রটির ১১ জনকে আটক করেন এলাকাবাসী। তাদের সবার বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিলো। তাঁরা সবাই এখন জামিনে আছেন। এ ঘটনার তদন্ত চলছে।

জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, সড়ক পাকাকরণ কাজের শুরুর দিকে কথিত ঠিকাদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেননি কেউ। তাকে রাস্তার উন্নয়নকাজের বিষয়টি এলাকাবাসী তাকে প্রথমে জানান। তারা সেখানে থাকতে বলায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এরপর এ ঘটনার মূল হোতা আবার তাকে আরেকটি রাস্তার কাজের বিষয়ে জানান। তখন তিনি এলজিইডির প্রকৌশলীসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে রাস্তার দরপত্রের বিষয়ে জানতে চান। তারা দরপত্র না হওয়ার বিষয়টি জানালে তার সন্দেহ হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় লোক পাঠিয়ে খোঁজখবর  নেন। পরে দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে চক্রের মূল হোতাসহ ১১জনকে ধরে পুলিশে দেন। 

পুলিশ ও এলাকাবাসী বলেন, সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কটি পাকাকরণের জন্য গত ১২ মে ময়নার মোড় এলাকায় উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজটি করবেন আবদুল মান্নান। পরদিন থেকেই মান্নানের লোকজন সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিভিন্ন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। কিন্তু সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। পরে তাঁরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত রশিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য জামিল হাসান বলেন, ‘আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। বোঝার উপায় ছিল না। কারণ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমপি ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এমপি আসার খবরে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করেন, এমন প্রতারণা হবে-আমরা একটুও বুঝতে পারিনি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। কারণ, রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করার উপায় নেই।’

ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। জামালপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রুহুল আমিন বলেন, উদ্বোধনের সময় সংসদ সদস্যের যাওয়ার খবরে তিনিও গিয়েছিলেন। তখন তারা প্রতারণার বিষয়টি টের পাননি। এটা দুর্র্ধষ চুরির ঘটনা। বিষয়টি হাস্যকরও।

জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজনীন আখতার বলেন, উদ্বোধনের বিষয়টিও তিনি জানেন না। সংসদ সদস্য তার কাছে ওই রাস্তার বিষয়ে জানতে চান। পরে তিনি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন সেখানে কোনো কাজ হচ্ছে না। পরে বিষয়টি তিনি সংসদ সদস্যকে জানান। 

জামালপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বলেন, ওই রাস্তায় কোনো উন্নয়নকাজের দরপত্র হয়নি। ইট না থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই রাস্তা করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার কথা বললেও এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!