ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের ২৭ বছর পার হলেও এখনও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা। তবে নারী নির্যাতনের বিচার সঠিকভাবে না হওয়া ও সহজভাবে আইনের ফাকফোকড় দিয়ে বেচে যাওয়ায় নারী নির্যাতন বাড়ছে বলে মনে করেন নারী নেত্রী।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগষ্ট দিনাজপুরের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে। আজকের এই দিনে জেলার কাহারোল উপজেলার দশমাইলের অদূরে কতিপয় বিপথগামী পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার হন তৎকালীন ১৮ বছর বয়েসী কিশোরী ইয়াসমিন। শুধু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হননি কিশোরী ইয়াসমিন, পরদিন মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ বলতে থাকে “মরদেহটি একজন পতিতার”। এতে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের সাধারণ মানুষ। শুরু হয় তীব্রতর আন্দোলন। আন্দোলনের একপর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বিনা উস্কানিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে সামু, কাদের, সিরাজ ৭জনকে হত্যা করে। আহত হয় ৩ শতাধিক আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষ।
.png)
নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩০ বছর পার হলেও এখনও নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি। গত ১ আগস্ট রাতে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ৭ নম্বর বিজোড়া ইউনিয়নের বিজোড়া (সুতারপাড়া) গ্রামে স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার শ্যামলী (৫০)কে প্রথমে কুপিয়ে ও পরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে হত্যা করেন তার স্বামী মাহবুবুর রহমান। পরে পুলিশ ঘাতককে গ্রেপ্তার করে। গত ১৭ আগস্ট দিনাজপুর সদর উপজেলার মুরাদপুর হাজীপাড়ায় পারিবারিক কলোহের জের ধরে কানিজ ফাতেমা (৪৩) নামে এক নারীর হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি সহিংসতা, হামলাসহ নানান ধরনের ঘটনা ঘটছে।
দিনাজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারী থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, নির্যাতনের মামলা হয়েছে ২১০টি। আর শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯৫টি। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে ৪ হাজারের অধিক মামলা চলমান রয়েছে।
এদিকে দিনাজপুর জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসে লিগ্যাল এইড অফিসে ১৯২টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে ৮৬টি নিস্পত্তি করা হয়েছে।
সঠিক বিচার না হওয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না বলে দাবি করেছেন মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কানিজ রহমান। তিনি বলেন, “আজ সারাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হলেও দিনাজপুরে পালিত হচ্ছে ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি। ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ৩১ বছরেও সমাজে এখন নারীরা নানানভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মূলত আইনের সঠিক প্রয়োগ ও আইনের বিভিন্ন ফাক ফোকড় দিয়ে দ্রুত জামিনে বের হয়ে যাওয়ায় নারীর প্রতি নির্যাতন বেড়েছে। চাঞ্চল্যকর রামিসা হত্যার মামলার বিচার হয়েছে। কিন্তু সেই বিচারের রায় কার্যকর হয়নি। এমনকি গতকাল (রোববার) রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যদি আসামিদের দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করা হয় তাহলে সমাজের নারী নির্যাতন অনেকটা কমে যাবে বলে আমি মনে করি।”
এদিকে গত ২০২৪ সালের ৩ মে রাতে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হয় ইয়াসমিনের মা শরীফা বেগমের।
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে উপলক্ষে দশমাইল মোড়ে অবস্থিত ইয়াসমিনের স্মৃতিসৌধে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করা কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন, ইয়াসমিনের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি মহিলা পরিষদ দিন ব্যাপী নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।
যেভাবে ঘটেছিল ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ভোরে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী হাছনা এন্টারপ্রাইজ নৈশ কোচ-এর সুপার ভাইজার ১৮ বছর বয়েসী ইয়াসমিন নামে এক তরুনীকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামিয়ে দেয় এবং এক চায়ের দোকানদারকে বলে সকাল হলে তরুণীটিকে যেন দিনাজপুর শহরগামী বাসে উঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেখানে পৌছে নৈশ্য টহল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান। পুলিশ সদস্যরা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে থাকা তরুণী ইয়াসমিনকে নানা প্রশ্ন করে এক পর্যায়ে দিনাজপুর শহরে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে জোর করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নেয়। এরপর তারা দশমাইল সংলগ্ন সাধনা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে দিনাজপুর শহরের রানীগঞ্জ মোড়ে ব্র্যাক অফিসের সামনে রাস্তার ধারে মরদেহ ফেলে রেখে চলে যায়।
এ ঘটনায় দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে দোষীদের শাস্তির দাবি করা হয়। ২৬ আগস্ট রাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জনতা কোতোয়ালি থানা ঘেড়াও করে। ২৭ আগস্ট সকাল থেকে প্রতিবাদী মানুষেরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। দুপুর ১২টার দিকে কয়েক হাজার জনতা বিক্ষোভ মিছিল সহকারে দোষীদের গ্রেপ্তর ও শাস্তির দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি প্রদান করতে যায়। এ সময় পুলিশ বিনা উস্কানিতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে সামু, কাদের, সিরাজ ৭ জনকে হত্যা করে। আহত হয় প্রায় ৩ শতাধিক মানুষ। শহরের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে ১৪৪ ধারা (কারফিউ) জারি করা হয়। শহরে নামানো হয় তৎকালীন বিডিআর। দিনাজপুর থেকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ ১৩ উপজেলার সব পুলিশকে একযোগে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনায় করা মামলাটি ৩টি আদালতে ১২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। মামলার রায়ে আসামি পুলিশের এএসআই মঈনুল, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্ম্মনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান ‘৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেন। আলামত নষ্ট, সত্য গোপন ও অসহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এএসআই মঈনুলকে আরো ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
অপরদিকে দণ্ডবিধির ২০১/৩৪ ধারায় আলামত নষ্ট, সত্য গোপন, অসহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত আসামি দিনাজপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মোতালেব, ডা. মহসীন, এসআই মাহতাব, এসআই স্বপন চক্রবর্তী, এসআই জাহাঙ্গীর, এএসআই মতিয়ার-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের খালাস দেন।
চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় ৮ বছর পর অর্থাৎ ২০০৪সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর মধ্য রাত ১২টা ১মিনিটে মামলার অন্যতম আসামি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বিশ্রামপাড়ার জসিমউদ্দীনের ছেলে এএসআই মইনুল হক, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চন্দনখানা গ্রামের এসএম খতিবুর রহমানের ছেলে কনস্টেবল আব্দুস সাত্তারকে রংপুর জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
২০০৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে মামলার অপর আসামি নীলফামারী সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের লক্ষীকান্ত বর্মনের ছেলে পুলিশের পিকআপ ভ্যানচালক অমৃত লাল বর্মনকে রংপুর জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।