দীর্ঘদিনের এই নৌপথনির্ভরতার অবসান ঘটিয়ে এবার সড়কপথে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথে এগোচ্ছে দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। ভোলাকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে ঘোষণা দেন এবং দ্রুত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
সরকারের এ উদ্যোগে আনন্দিত ভোলাবাসী। তবে তাদের দাবি, নতুন মহাসড়কের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতুও বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের মতে, সড়ক নির্মাণ হলে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে; তবে ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মিত হলেই দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পূর্ণ অবসান ঘটবে।
.png)
মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত ভোলা দীর্ঘদিন ধরে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এ জেলার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় অনেক সময় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় জেলার বাসিন্দাদের। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় দীর্ঘদিনের অপূর্ণতা ছিল ভোলাবাসীর।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সেই অপেক্ষার অবসানের পথে এগোচ্ছে ভোলা। গ্যাস, রুপালি ইলিশ, কৃষি ও পর্যটনে সমৃদ্ধ এই জেলার পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে এখনো নৌপথ ও ফেরির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচ হয়। সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল সীমিত হয়ে পড়লে কার্যত দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দ্বীপজেলাটি।
স্বাধীনতার পর থেকেই ভোলা-বরিশাল সড়ক যোগাযোগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন ভোলার মানুষ। বিভিন্ন সময়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একটি সেতুর অভাবে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। এবার নতুন মহাসড়ক নির্মাণের ঘোষণায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন ভোলাবাসী।
‘দীর্ঘদিন ভৌগোলিক কারাগারে বন্দি ছিলাম’
ভোলা পৌরসভার আবহাওয়া অফিস রোড এলাকার বাসিন্দা বাদল বলেন, দ্বীপ জেলা হওয়ায় কোনো রোগী গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে বরিশাল বা ঢাকায় নিতে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার কারণে পথেই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে আমরা ভোলাবাসী দীর্ঘদিন ভৌগোলিক কারাগারে বন্দি ছিলাম। তবে ভোলা-মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে যে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন হলে আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাব।
ভোলার ট্রাকচালক মিলন বলেন, ভোলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ফেরির ওপর নির্ভর করতে হয়। শীতের কুয়াশা কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। আবার ফেরি সংকটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দুই-তিন দিনও গাড়ি নিয়ে ঘাটে অপেক্ষা করতে হয়। এতে বাড়তি খরচ হয়। সড়কপথে ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হলে আমরা খুবই উপকৃত হব।
বাড়বে কৃষি ও ব্যবসার সম্ভাবনা
ভোলার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, গ্যাস, কৃষি, রুপালি ইলিশ ও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে ভোলায়। সড়কপথে ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে জেলার ইলিশ, ক্যাপসিকাম, তরমুজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও উৎপাদিত পণ্য সহজে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো যাবে। এতে কৃষক ও খামারিরা ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে ভোলায় শিল্পকারখানা স্থাপনের সম্ভাবনাও বাড়বে। স্থানীয় গ্যাসসম্পদ কাজে লাগিয়ে শিল্পায়ন করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সড়কের আড়ালে যেন সেতুর দাবি চাপা না পড়ে
‘আমরা ভোলাবাসী’র সদস্যসচিব মীর মোশারেফ অমি বলেন, আমরা ভোলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল সেতুর জন্য আন্দোলন করে আসছি। এ দাবিতে ভোলার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্র হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে আমাদের প্রত্যাশা, সড়কের সঙ্গে সেতুর দাবির কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হবে না। ভোলার উন্নয়নের স্বার্থে সড়কের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিও বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়কের আড়ালে যেন সেতুর দাবি চাপা না পড়ে।
ভোলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল হক অনু বলেন, আধুনিক যুগেও বাংলাদেশে ভোলাই একমাত্র বিচ্ছিন্ন জেলা। এই বিচ্ছিন্নতা কাটাতে সরকার ভোলা-রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ রুটে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমরা খুশি। তবে আমরা মনে করি, এটি ভোলাবাসীর জন্য একটি সান্ত্বনা পুরস্কার। আমাদের মূল দাবি ভোলা-বরিশাল সেতু। লাহারহাট-বরিশাল হয়ে সারা দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হবে না। সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
ভোলার অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে
ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী গত ২২ আগস্ট সড়কপথে ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে আমরা ভোলার মানুষ আনন্দিত। এই যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হলে জেলার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। এর সুফল শুধু ভোলা নয়, পুরো বাংলাদেশ পাবে।
তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস এখন সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। এখানে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। ভোলার অর্থনীতির চেহারা পরিবর্তন হবে। এই যোগাযোগব্যবস্থা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে আমরা মনে করি।
নতুন রুট বাস্তবায়ন হলে রাজধানী ও বরিশালের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পণ্য পরিবহনে ভোগান্তি কমার পাশাপাশি গ্যাস, কৃষিপণ্য, ইলিশসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজে পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।
নির্মাণ হবে সাড়ে ২১ কিলোমিটার সড়ক
সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভোলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম বলেন, রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা রুটে নতুন করে সাড়ে ২১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। এ সড়ক নির্মাণ হলে ঢাকার সঙ্গে ভোলার যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।
তিনি জানান, বর্তমানে ভোলা থেকে লাহারহাট হয়ে বরিশালের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-ভোলা মহাসড়কের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্পের কাজ শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
সড়কের পাশাপাশি সেতুর অপেক্ষা
একদিকে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের ঘোষণা, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা ভোলা-বরিশাল সেতু প্রকল্প দুটি উদ্যোগই ভোলার যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভোলাবাসীর মতে, নতুন মহাসড়ক নির্মিত হলে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। তবে ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ ছাড়া জেলার দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পুরোপুরি অবসান হবে না। তাই সড়কের পাশাপাশি সেতু নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার দাবি তাদের।
প্রায় ৩ হাজার ৪০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভোলার সাত উপজেলায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বসবাস। গ্যাস, কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনে সম্ভাবনাময় এ জেলার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে শুধু ভোলা নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন মহাসড়কের ঘোষণা ভোলাবাসীর দীর্ঘ অপেক্ষায় নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। তবে সেই আশা পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন ঘোষণার গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তবে নির্মিত হবে প্রয়োজনীয় সড়ক ও সেতু। তখনই নদী পেরিয়ে মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে সত্যিকার অর্থে মুক্তি মিলবে ভোলাবাসীর।