ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

তিনমাস পর বনদস্যু আতঙ্ক নিয়ে বনে ঢুকলেন জেলে-বাওয়ালিরা

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:৩২, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তিনমাস পর বনদস্যু আতঙ্ক নিয়ে বনে ঢুকলেন জেলে-বাওয়ালিরা
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলেছে সুন্দরবনের দ্বার। তাই উপকূলীয় জনপদে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। জীবিকার টানে আবারো বনে প্রবেশ করতে শুরু করেছেন জেলে-বাওয়ালিরা। তবে, বনদস্যুদের আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না তাদের।

অভিযোগ, বনদস্যুদের অগ্রিম চাঁদা দিয়েই বনে প্রবেশ করছেন তারা।

দীর্ঘদিন পর সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায় জেলেরা নৌকায় জ্বালানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে বনে প্রবেশ করছেন। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।

Advertisement

অন্যদিকে, পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত হয়েছে সুন্দরবন। এতে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে কর্ম ব্যস্ততা।

জানা গেছে, সুন্দরবনের দ্বার খুললেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বনজীবীদের মধ্যে।

জেলেদের একটি অংশের অভিযোগ, বনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে গেলে দস্যুদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। তাছাড়া অপহরণের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে জীবিকার তাগিদে বনে গেলেও নিরাপদে ফিরে আসতে পারবেন কি না এ নিয়ে তাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।

বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বেলা ১২ পর্যন্ত জেলেদের জন্য ১৫৫টি পাস ইস্যু করা হয়েছে এবং একটি টুরিস্ট বোটকে পাস দেওয়া হয়েছে।

বন বিভাগ জানায়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পাশের সংখ্যা কম। আবহাওয়া অনুকূলে আসলে সংখ্যা আরো বাড়বে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট দুই হাজার ৯৩৮টি বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। এর মধ্যে মাছ আহরণের জন্য এক হাজার ১৪৮টি, কাঁকড়া আহরণের জন্য এক হাজার ৭০০টি, গোলপাতার জন্য দুটি, পর্যটকবাহী ট্রলারের জন্য ৭৪টি, লবণাক্ত পানির জন্য একটি এবং মধু আহরণের জন্য ১২টি বিএলসি রয়েছে। এ ছাড়া মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য আরও ৫০০টি ডিঙি নৌকা অনুমতি নিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে সুন্দরবনে অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতেও অভিযান চালিয়েছে বন বিভাগ। এ সময়ে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে ৫৫টি মামলা করা হয়েছে এবং ৫৫টি নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে। ৪৪ জনকে আসামি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে তিন হাজার ৮৫০ কেজি শামুক, একটি পিকআপ, এক হাজার কেজি মধু, ২৩০ কেজি সাদা মাছ, ১৩৫ কেজি চিংড়ি মাছ, চার বোতল বিষ এবং হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ২৭৮টি ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের মৌখালী গ্রামের জেলে শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ তিন মাস পরে আজ সুন্দরবনে যাব ভেবে ভালো লাগছে। মাছ কাকড়া ধরে পরিবার-পরিজনের মুখে খাবার তুলে দিতে পারব। তিন মাস খুবই কষ্টে দিন পার করেছি। অনেক টাকা ঋণ হয়েছি। সুন্দরবন থেকে আয় করে ঋণের টাকা শোধ করব।

বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালি গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন সুন্দরবন বন্ধ থাকায় খুব কষ্টে ছিলাম। আজ সুন্দরবন খুলে দিছে। বন বিভাগের কাছ থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করব। কিন্তু ভয় বনদস্যুদের নিয়ে। একদিকে ঋণের বোঝা অন্যদিকে বনদস্যু আতঙ্ক নিয়ে সুন্দরবনের প্রবেশ করতে হচ্ছে।

পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক মনির হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোন পর্যটক সুন্দরবনে যেতে পারেনি। এ সময় আমাদের ট্রলারগুলো বসে থাকায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ করে মেরামত করেছি। পর্যটক আসবে তাদেরকে নিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করিয়ে যে টাকায় আয় করবো সেই টাকা দিয়ে সংসার চালাবো এবং ঋণ শোধ করবো।

স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী মোকসেদ হোসেন জানান, সুন্দরবন বন্ধ থাকায় আমাদের ব্যবসায় মন্দা ছিল। কারণ সুন্দরবন এলাকায় অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবন থেকে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সুন্দরবন বন্ধ থাকার কারণে তাদের আয়ের কোন সুযোগ ছিল না। সে কারণে আমাদের বেচাকেনা কম ছিল। জেলেরা সুন্দরবনে যেতে পারেনি, এছাড়া পর্যটকরা ঘুরতে আসতে না পারায় করুন সময় পার করেছি। আজ সুন্দরবন খুলেছে, আশা করি সামনের দিনগুলো ভালো চলবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে সুন্দরবনে ঘুরতে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রহিম জানান, দুর্যোগ উপেক্ষা করে আমরা কয়েকজন বন্ধু ঘুরতে এসেছি। সুন্দরবনের প্রবেশের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখব।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবাইকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে অনুমতিপত্র নিতে হবে এবং বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে বনজীবীদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।

জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ ছিল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!