ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

কালের সাক্ষী সিরাজগঞ্জের নবরত্ন মন্দির

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ১২:১২, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কালের সাক্ষী সিরাজগঞ্জের নবরত্ন মন্দির
কালের সাক্ষী সিরাজগঞ্জের নবরত্ন মন্দির। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সিরাজগঞ্জে কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নবরত্ন মন্দির। প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুলের এই নবরত্ন মন্দির। মূল মন্দিরের আয়তনে ১৫ বর্গমিটারেরও বেশি। মন্দিরের নির্মাণ সময় সম্পর্কিত কোনও শিলালিপি পাওয়া যায়নি। আনুমানিক ১৭০৪-১৭২৮ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে রামনাথ নামক জমিদার মতান্তরে তহশিলদার এই মন্দির নির্মাণ করেন।

দুইপাশের ধানক্ষেতের বুক চিরে সেখান থেকে ছোট্ট একটি মেঠো পথ। আঁকাবাঁকা এই পথের ধারেই পোড়ামাটির কাব্যে গাঁথা অনন্য এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যদিও একসময় বর্ষাকালে মেঠোপথটি কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল বর্তমানে মন্দিরে যাতায়াতের রাস্তা সংস্কার করে পাকা করা হয়েছে। সেগুলোর অন্যতম একটি এই হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। তিনতলা বিশিষ্ট এই স্থাপনার ওপরের রত্ন বা চূড়াগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের কাছে মন্দিরটি ‘দোলমঞ্চ’ বা ‘দোলমন্দির’ নামেও পরিচিত। কথিত আছে, মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে রামনাথ ভাদুরী নামের এক ব্যক্তি মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তবে নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে এবং মন্দিরের নির্মাণ-সংক্রান্ত কোনো শিলালিপি বা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠালিপি পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে এটি ভাদুরী জমিদার পরিবারের মন্দির হিসেবেও পরিচিত।

Advertisement

মূল মন্দিরের বারান্দায় ৭টি ও ভেতরের দিকে ৫টি প্রবেশপথ আছে। দ্বিতীয় তলায় কোনও বারান্দা নেই। হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির তিনতলা বিশিষ্ট। এখানে আলাদা আলাদা কক্ষে ৯টা বিগ্রহ রয়েছে। তাই নবরত্ন মন্দির হিসেবে পরিচিতি পায়। পুরো মন্দিরের বাইরের দিক পোড়া মাটির অলঙ্করণে ঢাকা। এসব অলঙ্করণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানান দেবদেবীর মূর্তি, লতা-পাতা ইত্যাদি।

রামনাথ ভাদুরী দিনাজপুরের কান্তজি মন্দিরের মতোই এখানে একটি মন্দির তৈরি করেন। হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরের আশপাশে আরও তিনটি ছোট মন্দির রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরের উত্তর পাশে আছে শিব-পার্বতী মন্দির। পাশে দোচালা আকৃতির চন্ডি মন্দির এবং দক্ষিণ পাশের পুকুরের পশ্চিম পাড়ে আছে শিব মন্দির। সব মন্দিরেরই বর্তমানে দেখভাল করছে সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর। কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত, দেশ বিভাগ ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে হারিয়ে যায় জমিদারের পূর্ব পুরুষেরা। যুগযুগ ধরে কালের সাক্ষী হয়ে ঝোঁপঝাড় বুকে নিয়ে লুকিয়ে ছিল এই নবরত্ন মন্দির। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ ঐতিহ্যের এই নিদর্শন খুঁজে বের করেন। ভক্তদের রাত্রি যাপনের জন্য রয়েছে হাটিকুমরুলে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার চন্দ্র দাস বলেন, মন্দিরের চারপাশে জায়গাগুলো দখলমুক্ত করে পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে ধর্মীয় ভক্তদের সুবিধাসহ এই মন্দিরটি আরও হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম।
বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, মন্দিরের চারপাশের জায়গাগুলো দখলমুক্ত করে পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে ধর্মীয় ভক্তদের সুবিধার পাশাপাশি মন্দিরটি দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ১৯৮৬ সালের সিএস রেকর্ডে মন্দিরটি ‘দোল মন্দির’ নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। দোল উৎসবের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রাচীন এই স্থাপনাটি শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটন দিক থেকেও এর গুরুত্ব অনেক।

উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে আগত বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে সার্বিক সহযোগিতা করা হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই মন্দিরটিকে দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে দেশে ও বিদেশে প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই মন্দির প্রঙ্গনে ওয়াশরুম ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রত্নতত্ব বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!