ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
ইলিশের জোয়ারেও জেলেদের ঘরে নেই স্বস্তি, দাদনের ফাঁদে ৯০ হাজার পরিবার

নদী-সাগরে কোটি টাকার ইলিশ, জেলেদের ঘরে দেনার বোঝা

মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন, চরফ্যাশন (ভোলা) 
প্রকাশিত: ১৬:৫৯, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নদী-সাগরে কোটি টাকার ইলিশ, জেলেদের ঘরে দেনার বোঝা
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘চার দিন আগে পাঁচজন মাঝি-মাল্লা নিয়ে নদীতে নামছিলাম। যে মাছ পাইছি, তা ৬৬ হাজার টাকায় বেচছি। কিন্তু সেই টাকার সিংহভাগই মহাজনের দাদনের কিস্তিতে চলে গেছে। পকেটে যা আছিল, তা দিয়া আবার চাল-ডাল কিনতে দেনা করতে হইছে।’

ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাটে নোঙর করা নৌকায় বসে রোদে শুকানো ছেঁড়া জাল সেলাই করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ৩২ বছর বয়সী জেলে আবদুল। চোখেমুখে রাতজাগা ক্লান্তি, সঙ্গে দেনার দুশ্চিন্তা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার উত্তাল নদীতে জীবন বাজি রেখে যারা রূপালি ইলিশ তুলে আনেন, উপকূলের সেই হাজার হাজার জেলের জীবন কীভাবে মহাজনের দাদনের কাছে বাঁধা পড়ে আছে, আবদুল যেন তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

একই ঘাটে জাল মেরামতের সময় রফিক মাঝি (৪২), ইদ্রিস (৩৭), আব্বাস উদ্দিন (২৩) ও রত্তন মাঝির (৪৪) কণ্ঠেও শোনা গেল একই আক্ষেপ। নদী ও সাগরে ট্রলার নামছে, জালের টানে ধরা পড়ছে ইলিশ। কিন্তু সেই মাছ জেলেদের জীবনে আনতে পারছে না আর্থিক স্বস্তি। বছরজুড়ে মহাজন ও আড়তদারদের দাদনের বোঝা বইতে গিয়ে উপকূলের হাজার হাজার পরিবার ঋণের চক্রে আটকে পড়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

Advertisement

মেঘনার পাড়ে বসা এক প্রবীণ জেলে বলেন, ‘নদী আর সাগরে ইলিশ মিললেও আমাগো কপালে দেনার খাতা চিরকাল খোলাই থাকে। আমরা সাগরে জীবন বাজি রাইখা মাছ ধরি ঠিকই, কিন্তু মহাজনের দাদনের দাসত্ব থাইকা আমাগো কোনো দিন মুক্তি মেলে না।’

চরফ্যাশনে প্রায় ৯০ হাজার জেলে

উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত জেলে ৪৪ হাজার ২৮১ জন এবং অনিবন্ধিত প্রায় ৪৬ হাজার। এছাড়া সমুদ্রগামী নিবন্ধিত ট্রলার রয়েছে ১ হাজার ৩৬৫টি।

তবে বিপুলসংখ্যক জেলে ও বড় মৎস্য অর্থনীতি থাকলেও তাঁদের আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রলারের জাল কেনা, জ্বালানি সংগ্রহ, নৌযান মেরামত কিংবা প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময়ে সংসার চালাতে অনেক জেলেকেই মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়।

জেলেদের অভিযোগ, দাদনের অন্যতম শর্ত হিসেবে আড়তদারের নির্ধারিত দামে মাছ বিক্রি করতে হয়। মাছ বিক্রির সময় নির্ধারিত কমিশনও কেটে নেওয়া হয়।

ফলে এক খেপে মাছ বিক্রির পর জেলেদের হাতে যে টাকা থাকে, তা দিয়ে অনেক সময় সংসারের খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী খেপে নদীতে যেতে আবারও নতুন করে ঋণ নিতে হয়। এভাবেই বছরের পর বছর ঋণের চক্রে আটকে থাকছেন অনেক জেলে।

সামরাজ ঘাটের কাশেম মাঝি (৫৬) ও কবির মাঝি (৪৫) জানান, নদীতে আগের তুলনায় ইলিশ মিললেও দেনা শোধ করার মতো অর্থ হাতে থাকে না। ট্রলার পরিচালনার খরচ, জ্বালানি ও আড়তদারের পাওনা পরিশোধের পর অনেক সময় তাঁদের হাতে কিছুই থাকে না।

দাদনে দেড়শ কোটি টাকা বিনিয়োগের দাবি

জেলেদের অভিযোগের বিপরীতে আড়তদারদের বক্তব্যও রয়েছে। সামরাজ মৎস্যঘাটের আড়তদার হেলাল উদ্দিন টিপু দাবি করেন, সামরাজ ঘাটের ৯৮ জন আড়তদার প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন।

তাঁর দাবি, আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় তেলের খরচ উঠলেও জেলেরা আড়তদারদের দাদন পরিশোধ করতে পারছেন না।

তবে স্থানীয় এক মৎস্যজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, আড়তদারদের একটি অংশ মাছের সংকট ও লোকসানের বিষয়টিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। তাঁর দাবি, নদীতে মাছ থাকার পরও ঘাটে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনিক তদারকি এড়াতেও জেলেদের ঋণ ও দারিদ্র্যের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।

ঘাটে চড়া ইলিশের বাজার

সরেজমিনে সামরাজ, ঢালচর, কচ্ছপিয়া, বকসীরঘাট, ঘোষেরহাট, খেজুরগাছিয়া, মাইনউদ্দি ও নতুন স্লুইসগেটসহ প্রধান মৎস্যঘাটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দেড় কেজি ওজনের এক হালি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। এক কেজি ওজনের এক হালি ৯ থেকে ১১ হাজার টাকা এবং ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ হালিপ্রতি ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভরা মৌসুমে এসব ঘাটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাছ লেনদেন হয়। কিন্তু এই বিপুল অর্থের কতটা প্রকৃতপক্ষে জেলেদের হাতে থাকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মাইনউদ্দি মৎস্যঘাটে ইলিশ কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভরা মৌসুমেও এক হালি মাঝারি ইলিশ সাত হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। আড়তদাররা নানা অজুহাতে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকিয়ে ডাক তোলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর ওপর ইলিশে ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য মাছে ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়। ক্রেতারা তো দাদন নেননি, তাহলে ক্রেতার কাছ থেকে কেন কমিশন নেওয়া হবে?’

সহজ ঋণ চান জেলেরা

স্থানীয়দের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ পাওয়ার জটিলতা এবং সরকারি সহায়তা পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক জেলেই বাধ্য হয়ে মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিচ্ছেন। সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ, জেলেদের জন্য কার্যকর আর্থিক সহায়তা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দাদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমতে পারে।

চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, বৃষ্টিপাত হওয়ায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তবে বাজারে দাম চড়া।

আড়তদারদের কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলেদের দাদন দেওয়ার কারণে হয়তো আড়তদাররা তাঁদের কাছ থেকে কমিশন নেন। তবে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকেও কমিশন নেওয়ার বিষয়টি জানা ছিল না। এ বিষয়ে মৎস্যঘাটের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইলিশের মৌসুমে নদী ও সাগরে জাল ফেলছেন হাজার হাজার জেলে। কোটি কোটি টাকার মাছ উঠছে ঘাটে। কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ যদি ঋণের কিস্তি ও বিভিন্ন খরচে চলে যায়, তাহলে রূপালি ইলিশের প্রাচুর্যও জেলেদের জীবনে স্বস্তি আনতে পারছে না।

মেঘনা-তেঁতুলিয়ার তীরে তাই ইলিশের জোয়ারের পাশাপাশি দীর্ঘ হচ্ছে জেলেদের দেনার খাতাও।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!