ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

বালুর স্তূপে চাপা কৃষকের স্বপ্ন

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:০৭, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বালুর স্তূপে চাপা কৃষকের স্বপ্ন
কামারখন্দের ঝাটিবেলাই আবাদি জমিতের রাখা নদী খননের স্তূপ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসময় নদীর পাড়ের আবাদি জমিতে চোখ জুড়িয়ে যেত সবুজ ফসলে। ভুট্টা, বেগুনসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করে ব্যস্ত সময় পার করতেন কৃষকেরা। জমিতে ফলানো ফসল বিক্রি করে চলত তাদের জীবিকার চাকা। কিন্তু সেই জমিতে এখন নেই কৃষকের ব্যস্ততা। দীর্ঘদিন ধরে বালুর স্তূপ পড়ে থাকায় আবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও গজিয়েছে আগাছা।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ঝাটিবেলাই এলাকায় ফুলজোড় নদীর সংলগ্ন আবাদি জমিতে নদী খননের বালু স্তূপ করে রাখায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, নদী খননের বালুতে শুধু জমিই নয়, চাপা পড়েছে কৃষকদের স্বপ্নও।

স্থানীয় কৃষক সোবাহান আলী ও শহিদুল ইসলাম জানান, কামারখন্দ উপজেলার ঝাটিবেলাই মৌজায় ফুলজোড় নদীর নাব্যতা বাড়াতে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী খনন করে। খনন করা বালু নদীর পাড়ের ব্যক্তি মালিকানাধীন আবাদি জমিতে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে ওই বালু স্থানীয় এক ইজারাদার সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেন।

তবে প্রশাসন ও ইজারাদারের মধ্যে চলমান আইনি জটিলতার কারণে কৃষিজমিতে থাকা বালু সরানোর কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমির ওপর বালু পড়ে থাকায় কৃষকেরা চাষাবাদ করতে পারছেন না। এতে বছরে লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

ইজারাদারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আবাদি জমির ওপর স্তূপ করে রাখা বালু দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, স্তূপ করে রাখা বালুর নিচে অন্তত ১০ জন কৃষকের প্রায় ১৫ থেকে ২০ বিঘা জমি রয়েছে। এসব জমিতে বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মণ পেয়ারা, ৭০ থেকে ১০০ মণ ভুট্টা এবং ৫০ থেকে ৭০ মণ বেগুনসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন হতো। কিন্তু বালুর স্তূপের কারণে অন্তত দুই বছর ধরে এসব জমিতে আবাদ বন্ধ রয়েছে। ফলে ফসল উৎপাদন করতে না পারায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন জমির মালিক ও কৃষকেরা।

জমির মালিক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জমির ওপর দীর্ঘদিন ধরে বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ফলে জমিতে কোনো কাজ করতে পারছি না। স্তূপ করা বালু সরিয়ে ফেললে আমরা আবার কৃষিজমি কাজে লাগাতে পারব।’

আরেক জমির মালিক কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেখানে যে বালু স্তূপ করে রাখা আছে, সেই বালু ইজারাদার কিনেছেন ঠিক। তবে বালুগুলো অন্যত্র পরিবহন করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও দ্রুত বালু সরিয়ে নিলে আমাদের জন্য ভালো হবে।’

ইজারাদার মো. আতিকুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ক্ষতি হোক, আমরা সেটাও চাই না। কৃষিজমি থেকে বালুগুলো সরিয়ে নিতে চাই। তবে আইনি জটিলতার কারণে এখন বালু সরাতে পারছি না। বালুগুলো সরিয়ে নিলে কৃষকেরা জমিতে আবাদ করতে পারবেন।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ হোসাইন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।’

কামারখন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ড. বিপাশা হোসাইন বলেন, ভূমি থেকে বালু সরানোর বিষয়ে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু গভীর রাতে গোপনে কাজ করার কারণে সংশ্লিষ্টদের আটক করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া আদালতে একটি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।

আইনি জটিলতার কারণে বালু সরানোর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন বিঘার পর বিঘা কৃষিজমি চাষাবাদের বাইরে রয়েছে, অন্যদিকে বালু সরিয়ে নিতে না পারায় ইজারাদারও লোকসানের মুখে পড়েছেন। দ্রুত সমস্যার সমাধান হলে কৃষকেরা আবার এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারবেন বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ/জেডআই/এমকে
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!