ঢাকা,  বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

দুই সেতুতে বদলে যাবে ময়মনসিংহের চিত্র

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩:৪৪, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুই সেতুতে বদলে যাবে ময়মনসিংহের চিত্র
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যানজট কমানো ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। এর একটি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার সেতুর আদলে পিলারবিহীন স্টিল আর্চ সেতু এবং অন্যটি কংক্রিট ও স্টিলের সমন্বয়ে নির্মিত সেতু। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ রয়েছে।

কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ সেতু

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাইপাস মোড় থেকে চায়না মোড় পর্যন্ত ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে কেওয়াটখালী সেতু। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত মূল সেতুটি হবে পিলারবিহীন স্টিল আর্চের। এর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১০০ মিটার। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

Advertisement

প্রকল্পের শুরু থেকেই নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তরসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। বিদ্যুতের খুঁটি, গ্যাসলাইন ও অন্যান্য সেবা সংযোগ সরাতেও সময় লেগেছে। নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো কর্মস্থল বুঝিয়ে দিতে না পারায় নির্মাণকাজের গতিও কিছুটা কমে যায়।

এসব জটিলতার কারণে ঋণচুক্তি ও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।

সওজের কেওয়াটখালী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. দিদারুল আলম জানান, সেতুর সঙ্গে ছয় লেনের সড়ক, ২৫০ মিটার দীর্ঘ রেলওয়ে ওভারপাস, টোল প্লাজা, বিশ্রামাগার, ওয়াচ টাওয়ার ও একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক থাকবে। ছয় লেনের মধ্যে চারটি ভারী যানবাহনের জন্য এবং দুটি মোটরসাইকেল ও হালকা যানবাহনের জন্য রাখা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ময়মনসিংহ নগরীর ব্রীজের মোড় এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও সহজ হবে। সীমান্তবর্তী এলাকা ও বিজয়পুর, নাকুগাঁও, হালুয়াঘাট এবং ধানুয়া-কামালপুর স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে দিঘারকান্দা বাইপাস থেকে কেওয়াটখালী পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ জমির মূল্য পেলেও স্থাপনার ক্ষতিপূরণ পাননি বলে দাবি করেছেন। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের অর্থ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।

রহমতপুর সেতু

শেরপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহ ও রাজধানীর যোগাযোগের দূরত্ব কমাতে রহমতপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে আরেকটি ব্রহ্মপুত্র সেতু। কংক্রিট ও স্টিল আর্চের সমন্বয়ে নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৭২ মিটার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

শেরপুর (কানাসাখোলা)-ভীমগঞ্জ-নারায়ণখোলা-রামভদ্রপুর-পরানগঞ্জ-ময়মনসিংহ (রহমতপুর) সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শেরপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহ ও রাজধানীর সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার কমবে। একইভাবে নাকুগাঁও স্থলবন্দর, কুড়িগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গেও যোগাযোগের দূরত্ব কমবে।

এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পাট ও কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের চতুর্থ প্যাকেজের আওতায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতুর পাশাপাশি রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। মূল সেতুতে ৩৩০ মিটার স্টিল নেটওয়ার্ক ট্রাসের তিনটি স্প্যান, ২৩টি পিসি গার্ডার, ৭৮৫ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক, আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল, স্ট্রিট লাইট, ফুটপাত, ড্রেন ও ইন্টারসেকশন থাকবে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খ.মো. শরীফুল আলম জানান, রহমতপুর সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০২৭ সালের জুনে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতাও এরই মধ্যে শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।

সেতু ঘিরে চরাঞ্চলের মানুষের আশা

দুটি সেতু নির্মাণে আশাবাদী ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, সেতু না থাকায় নৌকার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদেরও স্কুল-কলেজে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ময়মনসিংহের বড় একটি অংশের কৃষিপণ্য চরাঞ্চলে উৎপাদিত হলেও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। সেতু নির্মিত হলে কৃষকরা সহজে নিজেদের পণ্য বাজারে নিয়ে যেতে পারবেন বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি সেতুকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তবে কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ সেতুর সংযোগ সড়কের নকশা ও সেতুর মুখ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন নাগরিক নেতাদের কেউ কেউ।

সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, সংযোগ সড়ক চায়না মোড়ে গিয়ে মিশলে বর্তমানে ব্রীজের মোড়ে যে যানজট হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা চায়না মোড় ও শম্ভুগঞ্জ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তার মতে, শুধু বড় সেতু নির্মাণ করলেই যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে না; অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও নগর ব্যবস্থাপনায়ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

ময়মনসিংহবাসীর প্রত্যাশা, প্রকল্পের সময় ও ব্যয় অযথা না বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। এতে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!