পাহাড়ে সম্ভাবনাময় ফসল লেমনগ্রাস
ধানের পাতার মতো সরু-লম্বা পাতা। কাছে গেলেই নাকে আসে লেবুর সতেজ সুবাস। দূর থেকে দেখলে সাধারণ ঘাস মনে হলেও এর রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার ও বাজারমূল্য। নাম লেমনগ্রাস, বাংলায় লেবুঘাস। একসময় থাই স্যুপের উপকরণ হিসেবে পরিচিত এই সুগন্ধি ঘাস এখন জায়গা করে নিয়েছে ভেষজ চা, নানা ধরনের পানীয়, প্রসাধনী, সাবান ও সুগন্ধি পণ্যে। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের আগ্রহ এবং ভেষজ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দেশে লেমনগ্রাস চাষে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
লেমনগ্রাস বা লেবুঘাস একটি সুগন্ধি ও বহুবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cymbopogon citratus এবং এটি ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের (Poaceae) অন্তর্ভুক্ত। এর পাতা ও কাণ্ড থেকে লেবুর মতো চমৎকার সতেজ সুবাস পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়া ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের এই উদ্ভিদ রান্নায় স্বাদ, ঔষধি গুণ ও সুগন্ধির জন্য বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়।
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ মুসলিমপাড়ায় গিয়ে দেখা মিলল সেই সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র। আমবাগানের ফাঁকে ফাঁকে সারি সারি লেবুঘাস, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মিষ্টি লেবুর ঘ্রাণ। এই বাগানের উদ্যোক্তা ফোরকান উদ্দিন মাত্র দশটি টবের চারা দিয়ে শুরু করেছিলেন এই চাষ। সেই চারা থেকেই আজ বিস্তৃত হয়েছে বাগান। শখের চাষ পেরিয়ে তাঁর চোখ এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে।
.png)
২০২৩ সালের জুনে ৪০ জাতের প্রায় দুই হাজার আমগাছ দিয়ে বাগান শুরু করেন ফোরকান উদ্দিন। গত বছরই প্রায় ১০ টন আম বিক্রি করেন তিনি। বর্তমানে বারি-৪, গৌরমতি, বানানা ম্যাংগো ও আম্রপালিসহ দেশি-বিদেশি নানা জাতের আম চাষ হচ্ছে তাঁর প্রায় পাঁচ একরের বাগানে। এর মধ্যে রয়েছে ডগমাই, কিং অব চাকাপাত, চিয়াংমাই, মিয়াজাকি, সূর্যডিম, ব্রুনাই কিং, রেড পালমার, বারি-১১, কাটিমন, আশ্বিনী ও হাড়িভাঙাসহ আরও অনেক জাত।
ব্যবসার সুবাদেই পাহাড়ে আসা ফোরকান উদ্দিনের বাড়ি চট্টগ্রামে। বিদেশে পড়াশোনার সময় ভিক্টোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কলেজ থেকে কুলিনারি আর্টসে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। মালয়েশিয়ায় থাকাকালে বিভিন্ন খাবারে লেবুঘাসের ব্যাপক ব্যবহার তাঁর নজর কাড়ে, বিশেষ করে থাই স্যুপে এর স্বাদ ও সুবাস তাঁকে আকৃষ্ট করে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় দেশে ফিরে নিজে লেমনগ্রাস চাষ করার আগ্রহ।
২০২৩ সালে ঢাকায় জাতীয় বৃক্ষমেলা থেকে দশটি টবের চারা সংগ্রহ করেন তিনি, যার প্রতিটির দাম ছিল ৫০ টাকা। এরপর নিজের আমবাগানের ফাঁকা জায়গায় সাথি ফসল হিসেবে তা লাগাতে শুরু করেন। বাগানের সব লেবুঘাস একসঙ্গে সংগ্রহ করা হলে প্রায় তিন টন ফলন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি তাজা লেবুঘাস প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।
ফোরকান উদ্দিন বলেন, "থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীন ভ্রমণের সময় লেবুঘাসের ব্যাপক ব্যবহার দেখেছি। বাংলাদেশেও চা, পানীয়, প্রসাধনী ও সুগন্ধি তৈরিতে এর বড় বাজার গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কম পরিচর্যায় উৎপাদন করা যায় বলে বাণিজ্যিকভাবে এটি লাভজনক ফসল হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে প্রায় দশ একর জমিতে চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের বাজারের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানিরও সম্ভাবনা দেখছি।"
তিনি আরও জানান, লেবুঘাসের পাতায় ঘ্রাণ তুলনামূলক কম, কিন্তু গাছের মূল কাণ্ড বা ডাঁটায় ঘ্রাণ পাতার তুলনায় প্রায় শতভাগ বেশি তীব্র ও সুগন্ধযুক্ত।
ফোরকানের উদ্যোগ শুধু চাষেই সীমাবদ্ধ নেই। বাগান থেকে সংগৃহীত তাজা পাতা ও ডাঁটা তিনি সরাসরি বিক্রি করছেন, পাশাপাশি আধুনিক স্মার্ট ড্রায়ারে লেমনগ্রাস শুকিয়ে বাজারজাত করারও পরিকল্পনা করছেন।
লেবুঘাসের ব্যবহার এখন আর রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নেই। এর পাতা ও ডাঁটা খাবারে সুগন্ধ ও স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়, পাশাপাশি ভেষজ চা ও বিভিন্ন পানীয় তৈরিতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। এ থেকে পাওয়া সুগন্ধি তেল ব্যবহৃত হয় প্রসাধনী, হারবাল ড্রিংক, এসেনশিয়াল অয়েল, সাবান, ডিটারজেন্ট, হেয়ার টনিক ও অ্যারোমাথেরাপির নানা পণ্যে।
মাটিরাঙ্গার উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, "রান্নার পাশাপাশি ভেষজ চা, পানীয়, প্রসাধনী ও সুগন্ধি শিল্পে লেবুঘাসের ব্যবহার রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস হতে পারে।"
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, "লেবুঘাস উষ্ণ আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। পাহাড়ি এলাকার অনেক জমিতেই এর চাষের সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে বাগানের ফাঁকা জায়গায় সাথি ফসল হিসেবে এটি চাষ করা যেতে পারে। তবে বড় পরিসরে চাষের আগে জাত, উৎপাদন খরচ, ফলন ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে যথাযথ পরামর্শ নেওয়া জরুরি।"
মাটিরাঙ্গার দক্ষিণ মুসলিমপাড়ার আমবাগানে তাই এখন শুধু আমের মৌসুমের অপেক্ষা নয়। সরু পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে নতুন এক কৃষি সম্ভাবনা। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া লেবুর সুবাস যেন জানান দিচ্ছে পাহাড়ের মাটিতেও লেখা যায় নতুন ফসলের গল্প।