সক্ষমতা বাড়ছে মোংলা বন্দরের, এক বছরে কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১৭.৬৬ শতাংশ
নাব্যতা উন্নয়ন, কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত করার মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং রাজস্ব আয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে বন্দরটি।
ওই অর্থবছরে মোংলা বন্দরে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টন কার্গো এবং ২৯ হাজার ৭২৪ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনার খালিশপুরের পোর্ট অডিটোরিয়ামে খুলনায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
.png)
তিনি বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি চাহিদা পূরণে মোংলা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও বন্দরটি ভূমিকা রাখতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও নৌপথ উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। বিপরীতে হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ পরিমাণ বেড়েছে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টন, যা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার টিইইউএস। সেখানে হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৯ হাজার ৭২৪ টিইইউএস। আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে ৮ হাজার ২৪৮ টিইইউএস বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে বন্দর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বা ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
গত অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। একই সময়ে ১২ হাজার ৭৫ ইউনিট রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি বেড়েছে ৪৯৬টি।
নাব্যতা উন্নয়নে ড্রেজিং
মোংলা বন্দরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ নাব্যতা ধরে রাখা উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে জেটির সামনে ৭ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিং করতে পারে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই সক্ষমতা ৯ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করার কাজ চলছে।
তিনি বলেন, পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং করা সম্ভব হলে জেটি পর্যন্ত ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
নির্মাণ হবে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল
বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে নেওয়া এ প্রকল্পের আওতায় দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বন্দরে আধুনিক হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম যুক্ত করা হবে।
বন্দর চেয়ারম্যান জানান, সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
অনলাইনে বাড়ছে সেবা
বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজ করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে বলেও জানান চেয়ারম্যান। পারমিশন, ইকুইপমেন্ট বুকিং ও বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। ই-পেপার সার্ভিসের কাজও শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচলে কোনো জট নেই বলেও জানানো হয় মতবিনিময় সভায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনারবাহী জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ১ দশমিক ৮০ দিন এবং অন্যান্য জাহাজের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৪৪ দিন।
বর্তমানে বন্দরের ছয়টি কনটেইনার ইয়ার্ডে প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস কনটেইনার সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া দুটি কার পার্কিং ইয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
মতবিনিময় সভায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) (দায়িত্বপ্রাপ্ত বিকল্প কর্মকর্তা) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কমান্ডার এস এম আফজালুল ইসলাম, পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ, উপপরিচালক (জনসংযোগ) হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, প্রোগ্রামার প্রকৌশলী সগীর আহমেদ, সহকারী ট্রাফিক ম্যানেজার মো. শামীম হাওলাদার, উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. সালাহ্ উদ্দিন কবিরসহ খুলনায় কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।