ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

১০ বছর পর ঘরের বাইরে জমেলা, হুইলচেয়ারে বসালেন ডিসি

শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৬:১৩, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ বছর পর ঘরের বাইরে জমেলা, হুইলচেয়ারে বসালেন ডিসি
দীর্ঘ ১০ বছর পর হুইলচেয়ারে করে ঘরের বাইরে জমেলা বেগম। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই জীবন কাটছিল শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের জমেলা বেগমের। কোমর থেকে নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় বিছানা ছেড়ে ওঠার সামর্থ্য নেই তার। অন্যের সহায়তা ছাড়া নড়াচড়া তো দূরের কথা, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজও করতে পারেন না।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সেই জমেলার জীবনে এলো ব্যতিক্রমী এক দিন। প্রায় এক দশক পর হুইলচেয়ারে বসে ঘরের বাইরে বের হলেন তিনি। তার বাড়িতে গিয়ে হুইলচেয়ার, ১০ হাজার টাকা ও খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন। পরে প্রশাসনের সহায়তায় তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘরের বাইরে আনা হয়।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমেলার বসতভিটায় মাটি ভরাট, একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

Advertisement

ঘরের বাইরে এনে হুইলচেয়ারে বসানোর পর কিছুক্ষণ নীরবে চারপাশ দেখছিলেন জমেলা। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পর মুক্ত বাতাসে বসার সুযোগটুকু তার জন্য ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৭০ বছর পেরোনো জমেলা প্রায় ৪০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। তার একমাত্র ছেলে জীবিত থাকলেও নিয়মিত খোঁজখবর নেন না। প্রায় ২০ বছর আগে মেয়েও মারা গেছেন। ফলে জীবনের শেষ সময়ে এসে কার্যত একাই দিন কাটছে তার।

অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের বসতভিটার মাটিও বিক্রি করতে হয়েছে জমেলাকে। তাতেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। অর্থের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ছাড়াই দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

যে ঘরে তার বসবাস, সেখানেও এতদিন বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। ফলে অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে কেটেছে দিনের পর দিন। চলাফেরার সক্ষমতা হারানোর পর তার জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

জমেলার জীবনে একসময় কিছুটা আশ্রয় হয়ে এসেছিল জোসনা নামে একটি মেয়ে। নিজের নাতনি হিসেবে তাকে লালন-পালন করেন তিনি। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় জোসনার বিয়ে হয়। বর্তমানে জোসনার পরিবারও অন্যের বাড়িতে বসবাস করে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও অসহায় জমেলার নিয়মিত দেখাশোনা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় কোনোভাবে জমেলার খাবারের ব্যবস্থা হয়। তবে চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবার অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, জমেলা এখনো কোনো সরকারি ভাতার আওতায় আসেননি।

মঙ্গলবার দীর্ঘ ১০ বছর পর ঘরের বাইরে এসে হুইলচেয়ারে বসার সুযোগ পান জমেলা। তার প্রয়োজন এখন নিয়মিত চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশন সুবিধার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সহায়তা।

জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘জমেলা বেগমের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছি। তাকে হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার জন্য নিরাপদ ঘর, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আওতায় তাকে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এ সময় শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও শিক্ষা ও আইসিটি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইফুল ইসলাম কমল, ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রাজিবুল ইসলাম, ইউপি সদস্য ও সাংবাদিক মো. জাহিদুল হক মনির, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংবাদিক মুজাহিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!