ঢাকা,  বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

অচল মেশিন সচল করে জীবিকা কবিরের

আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:১৯, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অচল মেশিন সচল করে জীবিকা কবিরের
আখাউড়ায় অচল সেলাই মেশিন সচল করতে ব‍্যস্ত সময় পার করছে কারিগর। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকায় সকাল থেকেই ভিড় জমে একটি ছোট্ট সেলাই মেশিন মেরামতের দোকানে। কেউ নিয়ে আসছেন বহু বছরের পুরোনো মেশিন, কারও মেশিনের চাকা ঘুরছে না, আবার কোনো মেশিনে বারবার সুতা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কারও সমস্যা সুই, ববিন কিংবা অন্য কোনো যন্ত্রাংশে।

অচল মেশিন খুলে ত্রুটি শনাক্ত করছেন কারিগর মো. কবির হোসেন বেপারী। প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রাংশ মেরামত কিংবা পরিবর্তন করে আবার সচল করে দিচ্ছেন মেশিন। এভাবেই প্রায় ৩২ বছর ধরে সেলাই মেশিন মেরামত করে জীবিকা চালাচ্ছেন তিনি।

Advertisement

আখাউড়ার রাধানগর এলাকায় ‘আল্লাহর দান’ নামে কেচি সান ও মেশিন মেরামতের দোকানটি ভাড়া নিয়ে কাজ করছেন কবির হোসেন। তার বাড়ি কসবা উপজেলার নেমতাবাদ এলাকায়। স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার পরিবার।

কবির হোসেন জানান, জীবিকার তাগিদে প্রথমে দর্জির কাজ শেখার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। সেখানে একটি টেইলার্সে কাজ শেখার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, সেলাই মেশিনে নানা ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে সেগুলো ঠিক করতে কারিগরদের কাছে যেতে হয়। এতে তার আগ্রহ তৈরি হয় মেশিন মেরামতের কাজে।

পরে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে ঢাকায় যান তিনি। সেখানে একটি সেলাই মেশিন মেরামতের দোকানে প্রায় তিন বছর কাজ করে হাতে-কলমে এ পেশার দক্ষতা অর্জন করেন। এরপর নিজ এলাকায় ফিরে এসে কাজ শুরু করেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় রাধানগরে দোকান ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন নিজের কর্মস্থল।

তিনি বলেন, শুরুতে কাজটি সহজ ছিল না। সেলাই মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার পাশাপাশি হাতে-কলমে দীর্ঘ সময় কাজ শিখতে হয়েছে। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের পরিধিও বেড়েছে। এখন আখাউড়ার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ নষ্ট মেশিন মেরামতের জন্য তার কাছে নিয়ে আসেন।

কবির হোসেন বলেন, আধুনিক সময়ে বাজারে বিভিন্ন ধরনের নতুন সেলাই মেশিন এলেও পুরোনো মেশিনের ব্যবহার এখনো রয়েছে। ফলে এসব মেশিন মেরামতের চাহিদাও আছে। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নেন তিনি। অচল একটি মেশিন মেরামত করে যখন আবার মানুষের কাজে লাগাতে পারেন, তখন তার ভালো লাগে। এ কাজ থেকে মাসে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হয় বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম মাধ্যম সেলাই মেশিন। দর্জির দোকান, ছোট পরিসরে পোশাক তৈরি কিংবা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। মেশিন নষ্ট হলে নতুন মেশিন কেনা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই পুরোনো মেশিনই মেরামত করে আবার ব্যবহার করেন তারা। এ কারণে দক্ষ মেরামতকারীদের চাহিদা রয়েছে।

দর্জি তাজু মিয়া বলেন, সেলাইয়ের কাজ অনেকটাই মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। মেশিন নষ্ট হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন মেশিন কেনা ব্যয়বহুল হওয়ায় মেরামত করেই কাজ চালিয়ে নিতে হয়। কবির হোসেন ভালো কারিগর হওয়ায় মেশিনে সমস্যা হলেই তিনি সেখানে নিয়ে যান।

গৃহিণী আলেয়া বেগম জানান, প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করছেন তিনি। গ্রামে নারীদের পোশাক তৈরির কাজের চাহিদা রয়েছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ সময়ে কাজ আরও বেড়ে যায়। পুরোনো মেশিন দিয়েই তিনি কাজ চালিয়ে আসছিলেন। কয়েক দিন ধরে মেশিনটি নষ্ট থাকায় কাজ করতে পারছিলেন না। পরে কবিরের কাছে নিয়ে গেলে দ্রুত সমস্যার সমাধান করে দেন তিনি।

সেলিনা আক্তার বলেন, তার মেশিনটি অনেক পুরোনো। কয়েক দিন ধরে বারবার সুতা ছিঁড়ে যাচ্ছিল, পাশাপাশি চাকার ঘোরার ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছিল। তাই মেশিনটি মেরামতের জন্য কবিরের দোকানে নিয়ে আসেন।

মার্জিয়া আক্তার জানান, তাদের বাড়ির মেশিনটি অনেক পুরোনো। তার মা এটি দিয়ে নিয়মিত টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করেন। কয়েক দিন ধরে মেশিনটি অচল হয়ে পড়লে সেটি মেরামতের জন্য নিয়ে আসেন। কয়েকটি নতুন যন্ত্রাংশ লাগানোর পর মেশিনটি সচল হয়। যন্ত্রাংশ ও মেরামত বাবদ তার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, সেলাই মেশিন মেরামতের এই পেশা শুধু কবির হোসেনের জীবিকার পথ তৈরি করেনি, বরং স্থানীয় দর্জি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাজও সচল রাখতে সহায়তা করছে। একটি নষ্ট মেশিন মেরামত হয়ে আবার চালু হলে তার সঙ্গে অনেকের উপার্জনের পথও সচল হয়ে ওঠে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আখাউড়া/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!