নিজের কবর খুঁড়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় আব্দুর রহিম
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কুশাডাঙ্গা গ্রামের আব্দুর রহিমের বাড়িতে গেলেই চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী একটি স্থাপনা। ইট-পাথরে তৈরি পাকা কবরটির চারপাশ পরিপাটি। রয়েছে পিলার, ছাদ ও ছোট ছোট মিনার। প্রথম দেখায় স্থাপনাটি কবর বলে বোঝার উপায় নেই। অথচ গত পাঁচ বছর ধরে নিজের হাতে তৈরি এই কবরের পাশেই নিয়মিত সময় কাটাচ্ছেন আব্দুর রহিম।
শুধু নিজের জন্য নয়, মৃত্যুর পর স্ত্রীকে পাশে দাফন করার ইচ্ছায় পাশাপাশি আরেকটি কবরও প্রস্তুত করে রেখেছেন তিনি। প্রতিদিন নিজের তৈরি কবরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। কোথাও ধুলা জমলে নিজেই তা পরিষ্কার করেন।
আব্দুর রহিম বলেন, মৃত্যুর পর সন্তানরা তাকে ও তার স্ত্রীকে দাফন করবে কি না, তা নিয়ে তার মনে শঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জীবিত থাকতেই নিজের ও স্ত্রীর কবর প্রস্তুত করে রেখেছেন তিনি।
তার ভাষায়, মৃত্যুর পর যেন তাকে ও তার স্ত্রীকে পাশাপাশি দাফন করা হয়, এটিই তার শেষ ইচ্ছা।
মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতার বিষয়েও আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, পরিবারের ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে জন্য জীবিত থাকতেই চল্লিশা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজনও সম্পন্ন করেছেন।
আব্দুর রহিমের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার বাড়িতে আসছেন। কেউ কৌতূহল নিয়ে কবরটি দেখতে আসছেন, আবার কেউ এটিকে জীবনের অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে তার নিজস্ব উপলব্ধি হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রশিদ বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আব্দুর রহিম নিজের তৈরি কবরটির যত্ন নিচ্ছেন। তার এই ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ড দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ কুশাডাঙ্গা গ্রামে আসছেন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, জীবনে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখেননি। নিজের জন্য কবর তৈরি করে সেটি পাকা করে রাখার ঘটনা তাদের কাছে ব্যতিক্রমী। প্রায় প্রতিদিনই কবরটি দেখতে আব্দুর রহিমের বাড়িতে মানুষের ভিড় হচ্ছে।
এ বিষয়ে মুফতি মাহফুজুর রহমান বলেন, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যক্তিগত কবর পাকা করা ও তা নিয়ে এভাবে স্থাপনা নির্মাণের কোনো নজির রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের যুগে পাওয়া যায় না। তার মতে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির কবর পাকা করার পরিবর্তে কবরস্থানের সামগ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আব্দুর রহিম জীবিত অবস্থায় নিজের জন্য যে ধরনের কবর প্রস্তুত করেছেন, সেটিকে তিনি শরিয়তসম্মত নয় বলে মনে করেন।
পৃথিবীর মায়া ছেড়ে একদিন সবাইকেই চলে যেতে হবে। তবে জীবিত থাকতেই নিজের ও স্ত্রীর কবর প্রস্তুত করে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা আব্দুর রহিমকে ঘিরে কুশাডাঙ্গা গ্রামে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল। তার এই উদ্যোগকে কেউ দেখছেন মৃত্যুচিন্তা থেকে নেওয়া ব্যতিক্রমী প্রস্তুতি হিসেবে, আবার কারও কাছে এটি জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির প্রকাশ।