ঢাকা,  শুক্রবার   ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

দুই পা অচল, তবু থেমে নেই নাসিমার জীবনযুদ্ধ

সাইফুল ইসলাম রয়েল, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
দুই পা অচল, তবু থেমে নেই নাসিমার জীবনযুদ্ধ
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুরে জন্ম থেকেই দুই পা অচল নাসিমা বেগম। চলাফেরা করেন হামাগুড়ি দিয়ে। তবু জীবিকার তাগিদে থেমে থাকেননি তিনি। কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে রেণু পোনা শিকার করেন, কখনো রোদে পুড়ে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতের কাজ করেন। সামান্য উপার্জনে ছয় সদস্যের সংসার চালালেও নিজের পরিবারের জন্য জোটেনি একটি নিরাপদ ঘর। পলিথিন ও ত্রিপলে ঘেরা জরাজীর্ণ ঝুপড়িতে কাটছে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ ৩০ বছরের জীবন।

৪৪ বছর বয়সী নাসিমা বেগম পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর সদর ইউনিয়নের নজিবপুর গ্রামের বাসিন্দা। দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারের সন্তান নাসিমার জন্ম থেকেই দুই পা অচল। শৈশব থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করতে হয় তাঁকে। প্রায় ৩০ বছর আগে জেলে মতিয়ার রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর।

প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেননি নাসিমা। জীবিকার সন্ধানে নেমেছেন নদীতে। হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করেই রেণু পোনা শিকার করেন। পাশাপাশি শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার।

নাসিমার তিন মেয়ে। তাঁদের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয়েছে। তবে পারিবারিক নানা টানাপোড়েনে দুই মেয়ে ও দুই নাতনিসহ বর্তমানে ছয় সদস্যের সংসার সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। স্বামী মতিয়ার রহমানও অসুস্থতার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না। ফলে পরিবারের উপার্জনের প্রধান ভরসা এখন নাসিমা নিজেই।

প্রতিদিনের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যে ঘরে ফেরেন, সেটিও বসবাসের উপযোগী নয়। নিজস্ব জমিজমা না থাকায় প্রায় তিন দশক ধরে গ্রামের এক টুকরো খাসজমিতে পলিথিন ও ত্রিপল দিয়ে ঘেরা ঝুপড়িতে বসবাস করছে পরিবারটি। ঘরের ছাউনি নেই বললেই চলে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানি বাড়লে ঘরেই পানি ঢুকে পড়ে। দুর্যোগের রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ঘুম সময় কাটাতে হয় নাসিমাকে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করলেও পরিবারটি সরকারি আবাসন সুবিধা পায়নি। তাঁদের মতে, নাসিমার পরিবারের জন্য একটি টেকসই ঘরের ব্যবস্থা করা জরুরি।

একই গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, “এই গ্রামে নাসিমার পরিবারের মতো অসহায় পরিবার আর নেই। তাঁদের প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ দেখলে মন কেঁদে ওঠে। সমাজের বিত্তবান মানুষ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।”

স্থানীয় শাহ আলম বলেন, নাসিমার ঘরটি বসবাসের অনুপযোগী। ঝড়-বৃষ্টির সময় ঘরের চারপাশ কাদাপানিতে একাকার হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটির নিরাপদে বসবাসের জন্য সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা করতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

নাসিমা বেগম বলেন, “আমার এক মেয়ের এখনো বিয়ে হয়নি। আরেক মেয়ের স্বামী তার খোঁজখবর রাখে না। অন্য মেয়ে স্বামীর বাড়িতে থাকে। বর্তমানে দুই মেয়ে, দুই নাতনি, আমার স্বামী ও আমি মিলে সংসার করছি। কিন্তু স্বামী অসুস্থ থাকায় বেশ কিছুদিন ধরে মাছ শিকারে যেতে পারছেন না।”

নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন আমি একাই রেণু পোনা শিকার করি এবং শুঁটকি পরিষ্কারের কাজ করি। এই কাজ করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে। আমাদের ঘরটি খাসজমিতে। পলিথিন দিয়ে ঘেরা, ঠিকমতো চালাও নেই। ঝড়-বৃষ্টির সময় পানি ঢুকে ঘর তলিয়ে যায়। তখন দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। সরকারের কাছে আমার আবেদন, আমাদের থাকার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।”

অসহায় এই নারী আরও জানান, কেউ ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করতে চাইলে তাঁর দেওয়া বিকাশ নম্বর ০১৭২৫১৪৪৬৭১-এ সহায়তা পাঠাতে পারবেন।

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর না করে পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা প্রতিবন্ধী নাসিমা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তাঁকে সহযোগিতার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি সরকারি আবাসন প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ পাওয়া গেলে নাসিমাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

দুই পা অচল হলেও জীবনের কাছে হার মানেননি নাসিমা। প্রতিদিনের পরিশ্রমে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। এখন তাঁর চাওয়া, মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে ঝড়-বৃষ্টির রাতে অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন পরিবারের সদস্যরা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কলাপাড়া/একেকে/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!