ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]
আলিফ ফকির হত্যা মামলা

সাংবাদিক হত্যার আসামিদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৩৮, ২ নভেম্বর ২০২৬
সাংবাদিক হত্যার আসামিদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নেত্রকোনায় সাবেক সেনা সদস্য ও ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ ফেসবুক পেজের পরিচালক লুৎফর জামান ফকির ওরফে আলিফ হত্যার মূল মোটিভ এখন দুই আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসছে। রবিবারের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা এই মামলায় মোট চারজনকে আটক করেছে।

সর্বশেষ দুজনকে সুনামগঞ্জের বিশম্ভরপুর এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে শুটার তাজুলের পরিকল্পনাতেই খুন হন আলিফ ফকির। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আদালতের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আটক সাব্বির আহম্মেদ ও  ইমন

গত রবিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিচারক ও সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া আসামিদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করেন। পরে দুই আসামি ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) ও সাব্বির আহম্মেদকে (২৫) কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। জবানবন্দিতে এই খুনে মোট পাঁচজন অংশ নেওয়ার কথা উঠে এসেছে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের দিন প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার রবিন রাংসার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তিনি আলিফকে দুজনকে অনুসরণ করতে দেখেছিলেন। অন্যদিকে বিভিন্ন মানববন্ধনে আলিফের মায়ের দাবি, তাঁর ছেলেকে সরকারি বুলেটে হত্যা করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে বেশ কিছু গরমিল ও অসংগতি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকার এই ঘটনার পর পুলিশের রেকর্ডে নিহত আলিফের বিরুদ্ধেও আটক হওয়াসহ বেশ কিছু মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় পুলিশ, গোয়েন্দা ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত থাকা অবস্থায় লুৎফর জামান ফকির ওরফে আলিফ চাকরিচ্যুত হন। এরপর ২০২১ থেকে ২০২২ সালের দিকে তিনি ছদ্মবেশে সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। এ সময় আলিফ কখনো র‍্যাব, কখনো বিজিবি আবার কখনো পুলিশের সোর্সসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দিতেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি, মাদক ও চোরাচালানের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে সংবাদকর্মীদের সোর্স হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল তৎকালীন র‍্যাব (বর্তমান এসবিআর) কর্তৃক ২০১২ সালের একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজু’ গ্রেপ্তার হন। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত বিষয়টি গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাজুকে কোর্টে সোপর্দ করার ঘটনায় অভিযোগ তোলেন আলিফ ফকির। পরবর্তীতে তাজুল জামিনে মুক্ত হলে দুজনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।

এরপর ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে সাবেক সরকারের বিভিন্ন উচ্চ মহলের ছবিসহ নানা সম্পৃক্ততার পরিচয় তুলে ধরে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা শুরু করেন আলিফ। এ সময় বিভিন্ন ঘটনার আংশিক তথ্য প্রচার করলেও তিনি তা সম্পূর্ণ প্রকাশ করতেন না। একপর্যায়ে সীমান্ত এলাকা থেকে তিনিও আটক হন এবং পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জেলখানায় হত্যার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। জামিনে বের হওয়ার পর পুলিশের সঙ্গেও তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। এরপর তিনি ‘আইপি টিভি রূপালি বাংলা’র স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে সীমান্তে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে দুর্গাপুরে আলিফের ওপর হামলা হয়, যা নিয়ে তিনি একটি মামলা করেন। বর্তমানে আটক হওয়া আসামিদের একজন ইমন নামের ওই যুবক সেই মামলারও চার্জশিটভুক্ত আসামি।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া গ্রামে আলিফের দ্বিতীয় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার বাড়ির অদূরে রবিন রাংসার দোকান থেকে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আলিফ। রবিন রাংসার বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার সময় আলিফ দোকানে এসে ৬টি সিগারেট কেনেন এবং মোবাইলে কথা বলতে থাকেন। ওই সময় লুঙ্গি ও ট্রাউজার পরিহিত আরও দুজন অপরিচিত ব্যক্তি সেখানে সিগারেট কিনতে আসেন। রাত আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে চারপাশ যখন জনশূন্য ছিল, তখন দোকানে রাখা মোবাইল ফোনটি নিয়ে যাওয়ার ঠিক পরপরই গুলির শব্দ শোনা যায়।

পরদিন নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ এর পরের দিনই শুটার তাজুলের ভাতিজা সজিবুল ইসলাম অপূর্বকে আটক করে। এর কিছুদিন পর এসবিআর একই এলাকা থেকে আরেক শুটার শামীমের ভাগিনা আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে আটক করে। সবশেষ গত শনিবার ডিবি পুলিশ সুনামগঞ্জ জেলা থেকে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাজুলের নাম উঠে আসে।

দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানান, তাজুল ইসলামের সঙ্গে আলিফের পূর্ববিরোধ ছিল এবং সেই বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আটকরা তাজুলের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। সীমান্ত এলাকায় নানা অবৈধ ব্যবসায় আলিফ বাধা দিতেন এবং পুলিশকে তথ্য দিতেন এই ক্ষোভ থেকেও তারা এ ঘটনায় অংশ নেয়।

জবানবন্দিতে আসামিরা জানান, এই হত্যাকাণ্ডে মোট পাঁচজন অংশ নিয়েছিল। তাজুল নিজেই পিস্তল দিয়ে গুলি চালান এবং ঘটনাস্থলে কেউ চলে আসায় আলিফের মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। তবে এই ঘটনার পেছনে আরও অনেকের নাম এলেও তদন্তের স্বার্থে পুলিশ এখনই তা প্রকাশ করছে না।

অন্যদিকে জেলা পুলিশের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, নিহত আলিফ ফকিরের বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি মামলার আইনি তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত একটি মামলা বাদে বাকি সবগুলো মামলা চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি এবং চোরাচালান সংক্রান্ত (১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৩৮৭, ৩৮৬ ও ৩২৩ ধারা)। এর মধ্যে ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বারহাট্টা থানায় একটি, ২০২৪ সালের ২১ মার্চ কলমাকান্দা থানায় একটি এবং একই বছরের ৫ এপ্রিল আরও একটি মামলা হয়েছিল। তবে নারী ও শিশু মামলায় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তিনি অব্যাহতি পেয়েছিলেন।

ঘটনার পর থেকেই তথ্যের বিভিন্ন অমিল নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। এক দিকে আলিফের মায়ের দাবি তাঁর ছেলেকে সরকারি বুলেটে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিবিসি বাংলা সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে সতর্ক করার কথা জানানো হলেও কার মাধ্যমে বা কোন সূত্রে সতর্ক করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। স্বজনসহ সচেতন মহলের দাবি, পুলিশ নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উন্মোচন করবে।

ঘটনার পর থেকে সীমান্ত অঞ্চলের অপরাধ সংক্রান্ত পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুর্গাপুরের শুটার শামীম ও তাজুলের ফাইল পর্যালোচনা করা হচ্ছে। হত্যা ও অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাজুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৪ থেকে ১৫টি এবং শুটার শামীমের বিরুদ্ধে ২৫ থেকে ৩০টি মামলা রয়েছে। ২০১২ সালের অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার হন তাজুল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/নেত্রকোনা
ট্যাগ: পুলিশ হত্যা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!