ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

এক জাদুঘরেই ১০ দেশের সংস্কৃতি

গ্যালারিতে স্থান পাওয়া মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, আজারবাইজান, সেনেগাল, ভারত ও বাংলাদেশের পুতুলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নকশা ও টুপির ভিন্নতা দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৩:২২, ৪ নভেম্বর ২০২৬
এক জাদুঘরেই ১০ দেশের সংস্কৃতি
এক জাদুঘরেই ১০ দেশের সংস্কৃতি

ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব আকচায় একটি বেসরকারি জাদুঘরে মালদ্বীপ, কাতার ও তুরস্কসহ ১০ দেশের সংস্কৃতি ও লোকজ খেলনা প্রদর্শিত হচ্ছে। ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) উদ্যোগে ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর’-এর লোকজ খেলনা গ্যালারিতে এই সমাহার ঘটেছে।

গ্যালারিতে স্থান পাওয়া মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, আজারবাইজান, সেনেগাল, ভারত ও বাংলাদেশের পুতুলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নকশা ও টুপির ভিন্নতা দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। এসব পুতুলের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন।

জাদুঘরের অ্যাকাউন্টেন্ট জীবন চন্দ্র রায় বলেন, ‘এই পুতুল বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। পুতুলগুলোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাজসজ্জা দেখলেই সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।’

জাদুঘর দেখতে আসা কচুবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলে, ‘এখানে বিভিন্ন দেশের পুতুল দেখে ভালো লেগেছে। আগে বইয়ে বিভিন্ন দেশের নাম পড়েছি, কিন্তু তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক এভাবে একসঙ্গে দেখার সুযোগ হয়নি।’আন্তর্জাতিক পুতুলের পাশাপাশি গ্যালারির অন্য অংশে রয়েছে দলবদ্ধভাবে বসে থাকা নারী-পুরুষের প্রতিকৃতিতে গ্রামবাংলার মেলা ও হাটবাজারের সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে। অতীতে গ্রামের উঠান, বারান্দা বা গাছের তলায় বসে মানুষের আড্ডার দৃশ্য এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

জীবন চন্দ্র রায় আরও বলেন, ‘পুতুলের এই দলবদ্ধ বসার দৃশ্য আবহমান গ্রামবাংলার সামাজিক জীবন ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন বদলে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে এমন দৃশ্য আর আগের মতো পরিচিত নয়।’

প্রদর্শনী নিয়ে ঠাকুরগাঁও শহরের বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত ফারজানা বলে, ‘পুতুলগুলোকে গোল হয়ে বসে থাকতে দেখে মনে হচ্ছে, তারা সবাই মিলে গল্প করছে। বড়দের কাছে শুনেছি, আগে মানুষ অবসর সময়ে উঠানে বা বাড়ির সামনে একসঙ্গে বসে গল্প করত।’

একই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মারিয়া জাহান বলে, ‘আমরা এখন অবসর সময়ে অনেকেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। কিন্তু আগের দিনের মানুষেরা কীভাবে একসঙ্গে সময় কাটাতেন, এই প্রতিকৃতিগুলো দেখে তা কল্পনা করা যায়।’

লাটিম-মার্বেলে ফিরে দেখা হারানো শৈশব
গ্যালারির অপর অংশে রয়েছে গ্রামীণ সংস্কৃতির কাঠের খেলনা গাড়ি, ঠেলনা গাড়ি, লাটিম ও মার্বেলের মতো লোকজ খেলনা। দর্শনার্থী জাকির হোসেন তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণা করে জানান, তিনি লাটিম দিয়ে ‘গদ-গদ’ খেলা খেলতেন এবং সামান্য কয়েকটি মার্বেল বা লাটিম ঘিরেই বন্ধুদের মধ্যে আনন্দের আসর জমতো।

শিক্ষার্থী নির্ঝর আহমেদ বলে, ‘লাটিম ও কাঠের খেলনা গাড়ি দেখে ভালো লেগেছে। আমাদের কাছে এখন অনেক ধরনের আধুনিক খেলনা আছে, কিন্তু আগের দিনে শিশুরা কীভাবে এসব সাধারণ খেলনা দিয়ে আনন্দ পেত, তা জানতে পারছি।’

আরেক শিক্ষার্থী সবুজ রানা বলে, ‘আমাদের বাবা-চাচারা ছোটবেলায় কী ধরনের খেলনা দিয়ে খেলতেন, তা তাঁদের কাছে শুনেছি। এখানে পুরোনো দিনের খেলনা দেখে সেই কথাগুলো মনে পড়ছে।’

ইতিহাস ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, গ্যালারিতে জায়গা পেয়েছে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতি ও বাংলার অতীত জীবন। একদিকে ১০ দেশের পুতুলে ফুটে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অন্যদিকে দেশীয় খেলনা ও মানুষের প্রতিকৃতিতে ধরা পড়েছে গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি।

ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে বলেন, একটি পুতুল দর্শনার্থীকে ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়। আবার একটি লাটিম বা কাঠের খেলনা ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা শৈশবে। ফলে এই গ্যালারি শুধু প্রদর্শনীর নয়, অতীতকে জানা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ। পুতুলের পোশাকে যেমন মেলে দূরের দেশের পরিচয়, তেমনি লোকজ খেলনায় খুঁজে পাওয়া যায় নিজের মাটি ও শৈশবের গল্প।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ঠাকুরগাঁও
ট্যাগ: ঠাকুরগাঁও
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!