ঢাকা,  শনিবার   ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

কাজ নেই, আয় নেই, খলচান্দা কোচপাড়ায় অভাবের সঙ্গে লড়াই

নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৪৬, ৭ নভেম্বর ২০২৬
কাজ নেই, আয় নেই, খলচান্দা কোচপাড়ায় অভাবের সঙ্গে লড়াই
কর্মহীন হয়ে পাহাড়ের ঢালে বসে সময় পার করছেন কোচ আদিবাসীরা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী খলচান্দা কোচপাড়ার বাসিন্দাদের জীবন কাটছে অভাব-অনটনে। কাজের সুযোগ না থাকায় বছরের বেশির ভাগ সময় খাদ্যসংকটে ভুগছেন গ্রামের তিন শতাধিক মানুষ। বন থেকে লাকড়ি সংগ্রহের সুযোগ কমে যাওয়া, কৃষিকাজের সীমাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তাদের জীবনে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

‘তাইকো কাম বাবা হা, বিতা দেখে ছানা। এখন কাজকাম নাই, আমরা কী করে খাব? কেউ আমাদের খবর নেয় না।’ কোচ আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় এভাবেই আক্ষেপের কথা জানান শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের খলচান্দা কোচপাড়ার গৃহিণী পাপড়ি কোচ (৩৫)।

তিনি জানান, গ্রামে ৫৫টি পরিবারের তিন শতাধিক মানুষের বসবাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন তারা। শ্রম বিক্রি ও বন থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করাই ছিল তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। কিন্তু সামাজিক বনায়নের কারণে বনে এখন বিক্রির উপযোগী লাকড়ি পাওয়া যায় না। ফলে আয়ের পুরোনো পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

পাহাড়ের ঢালে অল্প পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করেন গ্রামবাসী। কিন্তু সেখানেও রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। প্রায়ই গারো পাহাড় থেকে বন্যহাতির পাল নেমে এসে আবাদি জমির ফসল নষ্ট করে দেয়। এতে অনেক সময় নিজেদের সারা বছরের প্রয়োজনীয় ধানও ঘরে তুলতে পারেন না তারা। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে চলতে হয়।

গ্রামের বাসিন্দা রঘুনাথ কোচ, পর্বেশরী কোচ ও সীতারাণী কোচ জানান, কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। প্রায় সবাই কৃষিশ্রমিক। বোরো ও আমন মৌসুমে ধান রোপণ এবং কাটার সময় নারী-পুরুষ মিলে শ্রমিকের কাজ করেন। কিন্তু দুই মৌসুম মিলিয়ে কাজের সুযোগ থাকে সর্বোচ্চ দেড় মাস। বছরের বাকি সময় তাদের বেকার থাকতে হয়।

তাদের অভিযোগ, গ্রামের দু-একজন বিধবা ভাতার টাকা পেলেও সরকারি সহায়তা তেমন মেলে না। ফলে নিত্যদিনের অভাব মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

ভারত সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের ঢালে ও চেল্লাখালী নদীর তীরে অবস্থিত খলচান্দা কোচপাড়া। সমতল থেকে পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত গ্রামটিতে যেতে হলে বারোমারী খ্রিস্টান মিশন থেকে প্রায় পৌনে দুই কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা এখনো অনুন্নত। গ্রামের প্রবেশপথটি কাঁচা হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় বাসিন্দাদের।

গ্রামে বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে শিক্ষার্থীদের দুই থেকে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। বর্ষায় রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার কারণে অনেক সময় বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না তাদের।

গ্রামের বাসিন্দা পর্বেশরী কোচ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামে বসবাস করলেও তাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। শুধু নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা ভোট চাইতে আসেন। তখন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধিরা আর গ্রামের খোঁজ রাখেন না।

সীতারাণী কোচ বলেন, কার্তিক মাসে গ্রামাঞ্চলে এমনিতেই কাজের সংকট থাকে। এ সময় অভাব আরও বেড়ে যায়। তার পরিবারের পুরুষ সদস্যরা পাশের নাকুগাঁও স্থলবন্দরে কাজ করতেন। কিন্তু সেখানেও এখন কাজ নেই। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্রামবাসীর দাবি, খলচান্দা কোচপাড়ার রাস্তাঘাট পাকাকরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/নালিতাবাড়ী/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!