রান্নার হাঁড়িতেই বিষের ঝুঁকি!
অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিলসহ রান্নার পাত্র নিরাপদ বা স্বাস্থ্যসম্মত মানের কি-না তা যাচাইয়ের কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেই, এমনকি সারাদেশের বাজারে থাকা এসব পণ্যের মান কেউ দেখেও না।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইসিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে বিষাক্ত সিসা ঢুকছে ভাত–খিচুড়িতে এমন তথ্য উঠে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ ধরনের পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতু কিংবা রান্নার পাত্রে সিসার জন্য কার্যত কোনো মানদণ্ড নেই।
আইসিডিডিআরবি বলছে, সিসা একটি বিষাক্ত ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার কোনো মাত্রা নেই যা নিরাপদ বলে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রের মান নির্ধারণ বিষয়টি সময়সাপেক্ষ, তবে এর কাজ চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, বাজারে থাকা পণ্যের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটশন বা বিএসটিআই বলছে, যারা এসব পণ্য উৎপাদন করে তারা তাদের ব্যবহৃত কাঁচামাল মানসম্মত কি-না কিংবা পণ্যে হেভি মেটাল আছে কি-না এসব নিজেরাই অনেকে বোঝে না।
দেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলই অ্যালুমিনিয়াম কুকওয়্যার তৈরির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।তিনি বলেন, ‘এটি সত্যি যে বেশির ভাগ কারখানাতেই মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি পুরো ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা। সরকারসহ সবাই মিলে কাজ করে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।'
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলছেন, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে লেড বা সিসা মিশে বলেই অনেক দিন ধরেই অ্যালুমিনিয়াম পাত্র ব্যবহার না করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো দেশের গৃহস্থালিসহ অসংখ্য খাবারের দোকানে রান্নার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিলসহ বিভিন্ন দ্রব্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

আইসিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা মিশতে পারে। বিশেষ করে নতুন পাত্র প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের সময় খাবারে সিসার পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে বলে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞপ্তি জানানো হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিলের বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরনো কাপড়ের সঙ্গে এ ধরনের পাত্র বিনিময়ের সংস্কৃতি আছে। গবেষণার ফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই একটি রান্নার পাত্র নিরাপদ হবে এমন ভাবার সুযোগ নেই।
‘স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতু ঠিকভাবে পরীক্ষা না করলে তৈরি পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে,’ গবেষণার ফল প্রকাশ করে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে আইসিডিডিআরবি।
স্ক্র্যাপ ধাতু বাংলাদেশে কারখানাগুলোতে ঠিকভাবে পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে হারুনুর রশিদ বলেন, ‘নাহ, এমন যাচাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া নেই। অ্যালুমিনিয়াম মেটাল রিসাইকেল করা হয়। লেড বা ক্ষতিকর কিছু আছে কি না তা যাচাইয়ের কোনো সিস্টেম নেই।’
চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি একরামুল হক বলেন, ‘বড় কিছু প্রতিষ্ঠান এগুলো যাচাই করে থাকে। কিন্তু বহু প্রতিষ্ঠান অ্যালুমিনিয়াম তৈরিতে জাহাজের ক্ষতিকর স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে থাকে। ছোটো অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো কিছু মেইনটেইন করে না। এগুলোর খোঁজ খবর নেওয়ারও কেউ নেই।’
আইসিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি ন্যাচার-এর জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে রান্না করা খাবারে কতটা সিসা মিশতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে।
আইসিডিডিআরবি জানিয়েছে, গবেষকরা বাংলাদেশের পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত পাত্র ও বাজার কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেছেন। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়। এরপর পাত্রগুলো গরম করে তাতে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। পরে পরীক্ষাগারে বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ মাপা হয়েছে।
‘গবেষণায় পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে, তা নতুন হোক আর পুরনো পাত্র হোক। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম ও খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে,’ সংস্থার বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, শিশুদের খাবারে সিসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ নির্ধারিত সিমা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম।
আইসিডিডিআরবি বলছে, পাত্র থেকে কী পরিমাণে সিসা খাবারে মিশে তা নির্ভর করে খাবারের পাত্র কীভাবে ধোঁয়া হয়েছে তার ওপর। ‘নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘরে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়লেও সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।’
গবেষকরা বলছে, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থার এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ এর বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘এসব পাত্র ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারের স্ক্রাবার দিয়ে ঘষা এড়িয়ে চলা উচিত এবং তাতে টক বা অম্লীয় খাবার রান্না না করাই ভালো। এসব সতর্কতাও দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করে না।’
ওই বিজ্ঞপ্তিতে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থার এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ এর প্রজেক্ট কো- অর্ডিনেটর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণের আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশনকে রান্নার পাত্রের জন্য সিসা সংক্রান্ত নিরাপত্তা মান তৈরির অনুরোধ করছি।’
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন বা বিএসটিআই এর পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন বলেন, তারা এ বিষয়ে অ্যালুমিনিয়াম কুকওয়্যার উৎপাদনকারী ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বসেও কোনো কার্যকর সাড়া পাননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা দুই দফা মিটিং করেছি। তারা স্বাস্থ্যসম্মত কিংবা হেভি মেটাল আছে কি-না বিষয়গুলো বোঝেও না। তবে আমরা অভিযান শুরু করবো। আগে এটা অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় ছিল ন। এখন এসেছে। সুতরাং একটি নিরাপত্তা মান প্রণয়ন করা হবে।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলছেন, অ্যালুমিনিয়াম পাত্র থেকে খাবারে লেড মিশছে এটি সত্যি এবং সেজন্য তারা অনেক দিন থেকেই এ ধরনের পাত্র ব্যবহার না করার জন্য সচেতন করার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এর একটি আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের কাজ চলমান আছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা