আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত এক দশকে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোকে ব্যয় সংকোচনের পরিমাণ চারগুণ বাড়াতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এ ধরনের ব্যয় সংকোচন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবায় ব্যয় কমিয়ে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
অক্সফামের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আইএমএফের পক্ষ থেকে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যম বা মাঝামাঝি বার্ষিক মাত্রা ছিল জিডিপির দশমিক ২১ শতাংশ। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে জিডিপির দশমিক ৮৫ শতাংশে। যা চার গুণেরও বেশি।
.png)
২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আইএমএফ প্রায় অর্ধেক দেশকে (৫৪টির মধ্যে ২৫টি) তাদের কর্মসূচি চলাকালীন জিডিপির ২ শতাংশের বেশি সরকারি ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। যেখানে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র এক-তৃতীয়াংশ (৪২টির মধ্যে ১২টি)। নিম্ন-আয়ের দেশগুলো সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির গড়ে ০.৮ শতাংশ ব্যয় করে, যেখানে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশের নিচে থাকে।
সংস্থাটি বলছে, এই ধরনের ব্যয় কমানোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। কারণ সরকারি অর্থ সংকোচনের ফলে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসনসহ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত খাতগুলোতে বিনিয়োগ ও ব্যয় বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এজন্য ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বড় ধরনের কৃচ্ছ্রসাধনের পরিবর্তে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সংস্থাটির শঙ্কা, আইএমএফ হয়তো ১৯৮০-এর দশকের সেই কঠোর ‘কাঠামোগত সমন্বয়’ বা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট কর্মসূচির দিকে ফিরে যাচ্ছে। যেখানে ধাপে ধাপে নয় বরং শুরুতেই এককালীন বড় ধরনের সরকারি ব্যয় কমাতে বাধ্য করা হয়। আইএমএফের এই নীতির সমালোচনা করেছেন অক্সফামের আন্তর্জাতিক জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা নাবিল আবদো। তিনি বলেন, ‘শুরুতেই কৃচ্ছ্রসাধনের চাপ দেওয়া এমন, যেন কোনো দেশকে একবারে পুরো বোতল বিষ খেতে বলা হচ্ছে- যে বিষ অল্প মাত্রাতেও ক্ষতিকর বলে আমরা জানি।’
তবে অক্সফামের এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মুখপাত্র জুলি কোজাক জানিয়েছেন, তাদের প্রতিটি ঋণ কর্মসূচিতেই ‘সামাজিক ব্যয়ের সীমা’ বা ‘সোশ্যাল স্পেন্ডিং ফ্লোর’ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর মূল লক্ষ্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ব্যয় সুরক্ষিত রাখা। এছাড়া কেবল ব্যয় কমানোর ওপর জোর না দিয়ে দেশগুলো কীভাবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব বা কর সংগ্রহ বাড়াতে পারে, সেদিকেও আইএমএফ কাজ করছে।
আইএমএফের এই বৈশ্বিক বিতর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার জন্যও প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে আইএমএফের অর্থনৈতিক সংস্কার ও ঋণ সহায়তার আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের কাজ চলছে। আইএমএফের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে অপ্রয়োজনীয় মূলধনি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক সামাজিক ব্যয়ের আওতায় সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং সীমিত সরকারি অর্থের মধ্যে অগ্রাধিকার সামাজিক ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি আইএমএফের আলোচনায় রয়েছে। জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর শেষে আইএমএফ জানায়, রাজস্ব আদায় শক্তিশালী করা ও ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে সামাজিক ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সুযোগ তৈরি করা দরকার। সেইসঙ্গে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর সংস্কারের প্রভাব কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তার কথাও বলা হয়।