শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরতে শুরু করেছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হয়েছে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম। প্রথম দিনেই প্রায় ৬ হাজার গ্রাহককে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে ব্যাংকটি।
আমানত ফেরতের পাশাপাশি সোমবার থেকে অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর কার্যক্রমও চালু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এতে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা ব্যাংকটির কার্যক্রমে কিছুটা গতি ফিরেছে।
.png)
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ উদ্যোগ নেয়। নতুন ব্যাংক গঠিত হলেও একীভূত পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলো এখনো পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দেশজুড়ে এসব ব্যাংকের মোট শাখা রয়েছে ৭৬১টি।
সোমবার আমানত ফেরতের প্রথম দিনে গ্রাহকেরা নিজ নিজ শাখা থেকে টাকা উত্তোলন করেন। এর আগে ১ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টাকা ফেরত নিতে আগ্রহী আমানতকারীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৭৪ হাজার আমানতকারী মোট ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। কোনো গ্রাহক টাকা তুলতে এসে অর্থ না পাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়বেন না—এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, আবেদনকারী সব গ্রাহকের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে প্রথম দিনে তাদের সবাই ব্যাংকে এসে টাকা তোলেননি। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অর্থ ব্যাংকেই রাখার কথা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ টাকা উত্তোলনের পর কিছু সময়ের মধ্যেই তা পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়েছেন।
রাজধানীর গুলশান, মহাখালী, বনানী ও মতিঝিল এলাকার কয়েকটি শাখা ঘুরে দেখা যায়, গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পর্যাপ্ত নগদ টাকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সকাল থেকেই অনেক আমানতকারী টাকা তুলতে শাখাগুলোতে ভিড় করেন। ব্যাংক কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে গ্রাহকদের স্বাগত জানান। যথাযথভাবে আবেদন করা গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।
একীভূত হওয়া ইউনিয়ন ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক এ বি এম মোকাররম মাহমুদ জানান, প্রথম দিনে আটজন গ্রাহক টাকা উত্তোলনের আবেদন করেন। তাদের মধ্যে চারজন অর্থ তুলে নিয়েছেন। অন্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব গ্রাহকের মুনাফার অর্থ জমা রয়েছে, তারাও তা উত্তোলন করতে পারছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংকটাপন্ন পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশি-বিদেশি আর্থিক নিরীক্ষায় এসব অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
এ পরিস্থিতিতে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। আগের মালিকদের মালিকানা বাতিল করে ব্যাংকগুলোর মালিকানা সরকারের হাতে নেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকারও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে।