ঢাকা,  শুক্রবার   ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]
উন্নয়ন ভাবনা— পর্ব ১

সৌরবিদ্যুৎ : বাংলাদেশে আশার আলো

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১১:৪৩, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সৌরবিদ্যুৎ : বাংলাদেশে আশার আলো
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জমির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে নতুন চিন্তার দরকার। জলাশয়ের ওপর ভাসমান সৌর প্রকল্প, মহাসড়কের পাশে সৌর স্থাপন, এমনকি সরকারি ভবনের বাধ্যতামূলক সৌর ব্যবহারের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বিদ্যুত সঙ্কট এখন নাগরিক জীবনের অন্যতম এক সমস্যার নাম। বিদ্যুৎ ছাড়া নাগরিক জীবন যেমন অচল তেমনি শিল্প অচলের কারণে অর্থনীতির চাকায়ও স্থবিরতা দেখা দেয়। বিদ্যুতের অভাবে নাগরিক জীবন, ঘর-সংসার, অফিস, ব্যবসা, কৃষি, শিল্প-কারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল কিছুই অচল, অনুৎপাদনমুখি, সৃজনহীন ও স্থবির হয়ে পড়ে। শুধু নাগরিক জীবন নয়, এখন গ্রামীণ জীবনের বিদ্যুৎ বিহীনে অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে। কিন্তু কেন সকল ক্ষেত্রে এই এককেন্দ্রিক নির্ভরতা! উপায় কি আর কোনো নেই? উপায় আছে- উপায় হলো— সৌর বিদ্যুৎ।

Bangladesh's largest solar park in Gaibandha ready for inauguration

সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশে অমিত সম্পভাবনাময় ক্ষেত্র

Advertisement

সৌরশক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে প্রয়োজনীয় প্রধান উপাদান সূর্য এবং সহযোগি আরো পাঁচটি উপাদান যথাক্রমে আলো, বাতাস, রোদ, গাছ-পালা এবং পানির উৎস বাংলাদেশে অফুরান। ঘন ঘন দীর্ঘস্থায়ী অতিষ্টকর লোডশেডিং থেকে জনজীবনকে সহনীয় করতে এবং উৎপাদন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উপর জোড় দিতে হবে। গৃহস্থালী চাহিদার পাশাপাশি শিল্প-কারখানাও সৌরশক্তি দিয়ে চলতে পারে। আমাদের দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেক মেটানো সম্ভব শুধুমাত্র কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সৌরশক্তি সংগ্রহের মাধ্যমে। বাসাবাড়ির ছাদগুলো, রেলওয়ের শেডগুলো, স্কুলসহ সরকারি সকল স্থাপনাছাদগুলো হতে পারে সৌর বিদ্যুতের উৎস। হাওর ও চরাঞ্চলের বিশাল খোলা প্রান্তর সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরাট সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। 

Press Release Page | Press Information Bureau
রেলওয়ের শেডগুলোতে সোলার স্থাপন

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রতিটি স্টেশনের শেডগুলো সৌর বিদুৎ উৎপাদনের অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে। রেলওয়ের শেডগুলো বিরাট জায়গাজুরে স্থায়ী কাঠামো হিসেবে করা হয়েছে। যাত্রীছাউনির কাজ ছাড়া এর অন্য কোনো প্রোডাক্টিভিটি নেই। এই শেডগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপন করে স্থানীয় বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সরকার এ বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবতে পারেন। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সকল সরকারি অফিস বা ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নিলে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমানো সম্ভব।

Solar Power Plants for Schools & Colleges - Solar Power Corporation

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সোলার

জানাগেছে দেশের কিছু স্কুল ও কলেজ নিজেদের ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ খরচ কমিয়েছে। একটি জেলা শহরের সরকারি স্কুলে ২০ কিলোওয়াটের একটি সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়। আগে যেখানে মাসে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো, এখন তার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে ক্লাসরুমের ফ্যান, লাইট এবং কম্পিউটার ল্যাব চালানো হচ্ছে। ফলে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, যা শিক্ষা খাতের অন্য কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে। অতএব দেশের সকল সরকারি বেসরকারি প্রাথমিক থেকে বিশ্ব বিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে ছাদে সোলার ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় গিড থেকে বিদ্যুতের চাপ কমানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষত যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্থাপনা রয়েছে তাদে;রকে অনতি বিলম্বে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা কার্যকর করা জরুরি।


আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌরবিদ্যুৎ 

বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমেরিকা, ফ্যান্স, জাপান, জার্মানি, ইংল্যান্ড, চীন ও ভারত সহ বিভিন্ন দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এখন অনুসরনীয় পর্যায়ে। জার্মানিতে সকল উপাদান বা উৎসের প্রাচুর্যতা না থাকা সত্বেও তারা ঠিক করেছে ২০৪০ সালের মধ্যে সমগ্র জার্মানি সৌরশক্তি দ্বারা চালিত হবে। নেপালের ৬০% মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। যে ৪০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন তারমধ্যে ২০ ভাগ জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর বিদ্যুৎ সুবিধা আর বাকি ২০ ভাগই সৌর বা জল বিদ্যুৎ সুবিধায় জীবনযাপন করছে। নেপালে সৌরবিদ্যুতের জনপ্রিয়তার কারণ হলো, সেখানকার গ্রামীণ এলাকায় ঘরবাড়িগুলো অনেক দূরে দূরে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের ভুর্তুকি প্রদান আরো একটি অন্যতম কারণ। পরিচ্ছন্ন, নবায়নযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় সরকার এতে ৭৫% পর্যন্ত ভুর্তুকি দিয়ে থাকে। 

চীনে সৌরবিদ্যুৎ :

চীনের বেইজিং বা সাংহাই শহরেরর বাড়িগুলোর ছাদের দিকে তাকালে দেখা যাবে পানির ট্যাংকের পাশে বিশাল সারি সারি সোলার প্যানেল। সেখানে শীতকালে সোলার প্যানেল ব্যবহার করা হয় ওয়াটার হিটার হিসাবে। এরিজোনা রাজ্যের সোলার প্যানেল প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠান ঘোষনা করেছে মঙ্গোলিয়ার ওরডোস সিটিতে এরা গড়ে তোলবে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনের চেয়েও বড় সোলার ফিল্ড। যেখান থেকে ৩০ লাখ বাড়িতে বিদ্যুত সরবরাহ করা যাবে। চীনের সরকার ও সেবরকারি  বাণিজ্য সংস্থা এবং এনজিও একযোগে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে। অচিরেই চীনে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সৌর প্যানেল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে। শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি পিভি সেল এখন তারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করে।

ভারতের মহাপরিকল্পনা : সৌরশক্তি নিয়ে জাতীয় গ্রিড

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ছোট শহর সাঁচি পুরোপুরি সৌরবিদ্যুতে চলছে। সাঁচি খ্যাতি অর্জন করছে ভারতের প্রথম ‘সোলার সিটি’ হিসেবে। একটি তিন মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শহরের সব বিদ্যুৎ আসে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেটির জন্য প্রায় ২০ লাখ ইউরো ব্যয় করেছে। সেইসঙ্গে শহরে একাধিক ই-চার্জিং স্টেশন, পানির কিয়স্ক, রাজপথে সৌরবাতি ও ছাদের উপর প্রায় দুই ডজন সৌর প্রণালীও রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতার মডেলের আওতায় সৌর শহর প্রকল্প কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে বছরে কার্বন নির্গমনও প্রায় ১৪,০০০ টন কমানো সম্ভব হচ্ছে। প্রায় ৮,০০০ জনসংখ্যার শহর সাঁচির সব সরকারি ভবনের ছাদে এখন সৌর প্যানেল বসানো আছে।

জানাগেছে সৌরশক্তি নিয়ে ভারতের জাতীয় গ্রিড তৈরি করা হচ্ছে। এরসাথে প্রতিটি রাজ্যের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে জুড়ে দেয়া হবে। সে দেশের মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে, বছরে এক কোটি সৌর বাল্ব প্রায় ৫০ কোটি লিটার কেরোসিন তেল বাঁচাতে পারে। এরফলে সরকারের ২ হাজার কোটি রুপি ভুর্তুকি বেঁচে যাবে। রক্ষা পাবে পরিবেশ। ভারতের অন্যতম প্রধান সোলার পিভি মডিউল প্রস্তুতকারী সংস্থা বিক্রম সোলার বিশ্বব্যাপী মোট সোলার মডিউল স্থাপনের ক্ষেত্রে ১০ গিগাওয়াট অতিক্রম করে নতুন মাইলফলক গড়ল।

এই সাফল্য শুধু সংস্থার অগ্রযাত্রার দিকেই ইঙ্গিত করছে না, বরং বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও প্রমাণ দিচ্ছে। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা কার্যত ২৫ মিলিয়নেরও বেশি সোলার মডিউলের সমতুল্য, যা প্রায় ৫০ লক্ষের বেশি ভারতীয় বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিক্রম সোলার তাদের স্থাপিত ক্ষমতা ৫ গিগাওয়াট থেকে দ্বিগুণ করে ১০ গিগাওয়াটে পৌঁছে দিয়েছে।

ভারতে সৌরশক্তি খাত দ্রুত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে এবং ইতিমধ্যেই দেশের মোট সৌর ক্ষমতা ১৫০ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই বৃদ্ধির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বিক্রম সোলার, যারা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ-কার্যক্ষমতাসম্পন্ন সোলার সমাধান সরবরাহ করে আসছে।

হোয়াইট হাউজে সৌরবিদ্যুৎ :

আমেরিকায় হোয়াইট হাউসের আবাসিক এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে সোলার প্যানেল সিস্টেম। এ প্যানেলের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের সাহায্যে প্রেসিডেন্ট ওবামার পরিবারের জন্য পানি গরম করার ব্যবস্থা করা হবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অন্যান্য কাজে লাগানো হবে।  তদ্রুপ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদভবন, সচিবালয়, সাংসদদের আবাসিক ভবনসহ সকল রাষ্ট্রীয় ভবনে সোলার স্থাপন করা দরকার। 

ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ :  

সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। করোনার সময় ২০২০ সালে মাত্র এক বছরের মধ্যে ভিয়েতনাম প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ ছিল ‘রুফটপ সোলার’। ২০১৮ সালে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে ২০২০ সালের শেষে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়, যা তাদের মোট সক্ষমতার ২৫ শতাংশ ছিল।

বাংলাদেশে অমিত সম্পভাবনাময় ক্ষেত্র

বাংলাদেশ সরকারের নীতিতে বলা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি গ্রামাঞ্চল ও উপশহর এবং শহর এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া। জ্বালানি সংশ্লিষ্ট আমদানি পণ্যের উৎস থেকে শুল্ক ও কর তুলে দেয়া কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সোলার প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণে সকল ব্যাংক ও তার শাখাগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ছাদে এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংক তাদের ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে। 

Poor development of on grid solar power in Bangladesh

  • বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌর শক্তির জন্য এক বিরল আশীর্বাদ। কারণ বাংলাদেশে বছরে ৩০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে যথেষ্ট রোদ থাকে, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল।

বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে ৬-৮ ঘণ্টা সূর্যালোক থাকে এবং প্রতি বর্গমিটারে ৪.৫-৫.৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা শক্তি পাওয়া যায়, যা সৌরবিদ্যুতের জন্য আদর্শ । তা পরিবেশের জন্য সুরক্ষামূলক।  ১ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ বছরে ১,৫০০ টন কার্বন নিঃসরণ রোধ করতে সক্ষম। প্রতি ১ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পে গড়ে ৫৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির করা সম্ভব। গ্রামবাংলার খোলা মাঠ, শহরের ছাদ, নদীর বুক— সব জায়গাতেই সূর্যের আলো যেন নিঃশব্দে শক্তির সম্ভাবনা বয়ে নিয়ে আসে। শহরের ছাদগুলোও এখন সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি সঠিক নীতিমালা ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে এই ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুতই একদিন জাতীয় উৎপাদনের বড় অংশ হয়ে উঠতে পারে। 

The FE - NBR exempts solar panels from VAT
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিবেদনে জানা যায়,

  • দেশের মোট আয়তনের ১ ভাগ জায়গা ব্যবহার করে ৪০ হাজার মেঘাওয়াট সৌরবিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব। আরো ২ হাজার মেঘাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন হতে পারে শুধু মাত্র বায়ুশক্তির ব্যবহার করে।

বাংলাদেশে ব্যবহার উপযোগী এবং ঘরে ঘরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গ্রিড সংযোগ দেয়ার মতো এমন একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছে আমাদের দেশীয় গবেষকরা। বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইলেক্ট্রনিকস এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক সৌরবিদুৎকে জাতীয়গ্রিডে যুক্ত করার ‘রুফ টপ গ্রিড কানেন্টেড সোলার ফটোভল্টেইক সিস্টেম’ নামে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। উদ্ভাবকেরা ১ দশমিক ১ কিলোওয়াট ক্ষমতার এই সৌরবিদুৎ ব্যবস্থাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তরিত শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপন করেন। 

শিল্পকারখানার ছাদ হতে পারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উত্তম বিকল্প 

শিল্পকারখানার অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে শিল্পকারখানার অব্যবহৃত ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ-সম্ভাবনা আরো বেশি। কারণ, গ্রিডের তুলনায় সোলার রুফটপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কম। ভূমিতে একটি সোলার বা সৌর প্যানেল বসাতে তিন থেকে সাড়ে তিন একর জমি লাগে। এ কারণে রুফটপ বিশেষত শিল্পকারখানার ছাদই হতে পারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো বিকল্প। বিদ্যুতের মূল্য ভবিষ্যতে বাড়তে পারে বিবেচনায় এভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অর্থনৈতিকভাবে আরও সাশ্রয়ী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইডকল স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিচ্ছে। 

গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানায় সোলার প্যানেল স্থাপন

জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ পেলেও লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের কারণে তাদের ডিজেল জেনারেটর চালাতে হতো, যা উৎপাদন খরচ অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছিল। পরে তারা কারখানার ছাদে প্রায় ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল স্থাপন করে। দিনে কারখানার বিদ্যুতের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এই সোলার থেকেই আসতে শুরু করে। ফলে তিন ধরণের বেনিসফিট পাওয়া যায়— ডিজেল ব্যবহার প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়। বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তারা বিনিয়োগের অর্থও তুলে ফেলতে সক্ষম হয়।

Solar Power Panel Use in Rural Bangladesh-2 [17] | Download Scientific  Diagram

  • গ্রামীণ জনপদে সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কিত তথ্য প্রচরণা জরুরি। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন, প্রয়োগ ক্ষেত্র, ব্যবহার, যন্ত্রপাতি ও সার্ভিসিং, ঋণ সহায়তা, কৃষি ও সেচের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার, কিস্তিতে ক্রয় সুবিধাসহ যাবতীয় সুবিধাবলীর বিষয়ে সরকারী বেসরকারিভাবে প্রচারণার মাধ্যমে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।

গ্রামীণ বাড়িঘর, ছোট-বড় ব্যবসা, হাট-বাজার, হাস-মুরগী বা গরু-ছাগলের খামার, মৎস্য খামার, হ্যাচারি, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের পরিবর্তে সৌরবিদুতের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিল করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় জমির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে নতুন চিন্তার দরকার। জলাশয়ের ওপর ভাসমান সৌর প্রকল্প, মহাসড়কের পাশে সৌর স্থাপন, এমনকি সরকারি ভবনের বাধ্যতামূলক সৌর ব্যবহারের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। (চলবে)

এস এম মুকুল : কৃষি-অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক, [email protected]
ফোনালাপ : ০১৭১২৩৪২৮৯৪

ডেইলি-বাংলাদেশ/DB-F-01
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!