ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

গালি দেওয়া কি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড

এম জহিরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১২:৫৬, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গালি দেওয়া কি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড
গালাগালিকে উৎসাহ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং জনপরিসরে ভাষার শালীনতা, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে অপরাধের সংজ্ঞাও স্পষ্ট রাখতে হবে।

গালি দেওয়া কি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। কিন্তু যখন অশালীন ভাষা, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কিংবা কাউকে অপমান করাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন প্রশ্নটি আর নিছক শব্দের খেলা থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তির মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমারেখা।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার-
গালাগালি কোনোভাবেই সভ্য আচরণ নয়। কাউকে অপমান করা, অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করা কিংবা তার পরিবার-পরিজনকে টেনে হেয় করা সামাজিকভাবে নিন্দনীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ হয়েছে। যুক্তির জায়গা দখল করেছে ব্যক্তিগত আক্রমণ; মতের বিরোধিতা গড়াচ্ছে চরিত্রহননে। অনেক সময় গালিই যেন যুক্তির শেষ অস্ত্র। কিন্তু গালি খারাপ—এই সত্য থেকে কি গালি ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হয়ে যায়? এখানেই মূল প্রশ্ন।

সন্ত্রাস শব্দটির একটি গুরুতর অর্থ ও সামাজিক-আইনি অভিঘাত রয়েছে। সাধারণভাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত থাকে ভয় সৃষ্টি, সহিংসতা, জবরদস্তি, গুরুতর ক্ষতির হুমকি অথবা রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য অর্জনে সহিংস পদ্ধতির ব্যবহার। ফলে কাউকে গালি দেওয়া এবং কাউকে ভয় দেখিয়ে বা সহিংসতার মাধ্যমে বাধ্য করাÑদুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ। একটিকে অন্যটির সমার্থক বানানো শুধু ভাষাগত অসতর্কতা নয়; এর আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতিও হতে পারে।

Advertisement

অবশ্য সব গালাগালি একই মাত্রার নয়। ‘তুই খারাপ’ বলা, অশ্রাব্য ভাষায় ব্যক্তিগত অপমান করা এবং ‘তোকে মেরে ফেলব’- এই তিনটি বক্তব্যকে এক পাল্লায় মাপা যায় না। শেষেরটি হুমকি; তার সঙ্গে বাস্তব সহিংসতার আশংকা থাকলে বিষয়টি নিছক বাক্যবিনিময়ের পর্যায়ে থাকে না।

আবার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া, হামলার আহ্বান জানানো কিংবা ভয় দেখিয়ে তাদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা আরও গুরুতর বিষয়। সেখানে বক্তব্যের ভাষা নয়, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য পরিণতিও বিবেচনায় নিতে হয়।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে শুধু ‘কী বলা হয়েছে’ নয়, ‘কেন বলা হয়েছে’, ‘কাকে বলা হয়েছে’, ‘কোন পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে’ এবং ‘এর ফলে বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কি না’- এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি। তা না হলে আইন প্রয়োগের নামে নির্বিচার ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়।

আর সেই সুযোগই সবচেয়ে বিপজ্জনক। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমাজে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা অনেক সময় তীব্র ভাষায় হয়। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, কটাক্ষ, ক্ষোভ বা প্রতিবাদও সব সময় মার্জিত ভাষায় প্রকাশ পায় না।

কোনো বক্তব্য রুচিহীন হতে পারে, অন্যায় হতে পারে, এমনকি নৈতিকভাবে নিন্দনীয়ও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে প্রতিটি কটু বক্তব্যকে ‘সন্ত্রাস’, ‘উসকানি’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসর দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসবে। রাষ্ট্রের হাতে আইন আছে; নাগরিকের হাতে আছে মতপ্রকাশের অধিকার। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই সভ্য রাষ্ট্রের পরীক্ষা। নাগরিকের অধিকার যেমন সীমাহীন নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতাও সীমাহীন হতে পারে না। 

এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যাবে না। অনলাইনে গালাগালি, অপমান, মিথ্যা তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও হুমকি- সবই সামাজিক ক্ষতি তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্যের সমাধান ফৌজদারি আইন নয়। কিছু আচরণের প্রতিকার সামাজিক নিন্দা, প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা, দেওয়ানি প্রতিকার বা অন্য উপায়ে সম্ভব। গুরুতর হুমকি ও সহিংসতায় উসকানির ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

সমস্যা হয় তখন, যখন সবকিছুর জন্য একই হাতুড়ি ব্যবহার করা হয়।  কাউকে গালি দেওয়া নৈতিকভাবে ভুল হতে পারে; কিন্তু নৈতিক ভুল আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এক জিনিস নয়। কাউকে অপমান করা এবং কাউকে ভয় দেখিয়ে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়াও এক নয়। আর এই পার্থক্য মুছে দেওয়া হলে ‘সন্ত্রাস’ শব্দটি তার প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব হারায়।

আরও বড় বিপদ হলো, ‘সন্ত্রাস’ শব্দটির বিস্তৃত ও ইচ্ছামতো ব্যবহার একসময় মতভিন্নতাকেও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আজ যে কটু ভাষাকে সন্ত্রাস বলা হচ্ছে, কাল হয়তো তীব্র সমালোচনাকেও একই অভিধায় ফেলা হবে। তার পরের ধাপে রাজনৈতিক বিরোধিতাও হয়ে উঠতে পারে ‘হুমকি’। গণতন্ত্রের ইতিহাসে এমন প্রবণতার পরিণতি কখনো সুখকর হয়নি।

তাই গালাগালিকে উৎসাহ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং জনপরিসরে ভাষার শালীনতা, দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে অপরাধের সংজ্ঞাও স্পষ্ট রাখতে হবে। গালি যদি হুমকিতে পরিণত হয়, সহিংসতার আহ্বানে রূপ নেয় কিংবা বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে, তখন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু নিছক অশালীন বা অপমানজনক ভাষাকে সন্ত্রাসের সঙ্গে এক করে দেখার আগে অনেক বেশি সতর্ক হওয়া দরকার।

কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কত দ্রুত শাস্তি দিতে পারে, তার মধ্যে নিহিত নয়; বরং ‘কোন আচরণে শাস্তি প্রযোজ্য আর কোনটি অসহ্য হলেও আইনের আওতার বাইরেÑসেই সীমারেখা কতটা ন্যায়সংগতভাবে টানতে পারে, তার মধ্যেই রাষ্ট্রের পরিপক্বতা প্রকাশ পায়।’

গালি বন্ধ করা দরকার-
কিন্তু তার জন্য সন্ত্রাসের সংজ্ঞা বড় করা নয়। বরং দরকার যুক্তির সংস্কৃতি শক্তিশালী করা, সামাজিক শালীনতা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে এমন একটি আইনি কাঠামো বজায় রাখা, যেখানে প্রকৃত হুমকি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোরতা থাকবে, কিন্তু সেই কঠোরতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গ্রাস করবে না।

শেষ কথা তাই খুব সরল- ‘সব গালি অপরাধ নয়, সব অপরাধও সন্ত্রাস নয়।’ আর এই মৌলিক পার্থক্যটি ভুলে যাওয়া শুধু ভাষার ভুল নয়- এটি নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্যও বিপজ্জনক।

লেখক : এম জহিরুল ইসলাম, সাংবাদিক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!