ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

যুগোপযোগী শিক্ষা ও যোগ্য শিক্ষক জাতি গঠনে অত্যাবশ্যক

হারুন-অর-রশীদ খান
প্রকাশিত: ১২:৩৭, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুগোপযোগী শিক্ষা ও যোগ্য শিক্ষক জাতি গঠনে অত্যাবশ্যক
একট শিক্ষিত, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের আন্দোলন শুরু হতে হবে শিক্ষক গড়ার মধ্য দিয়েই। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল ভালো ফল অর্জন বা চাকরির সনদ পাওয়া নয়, বরং এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা—যারা শিক্ষিত হবে কিন্তু অহংকারী হবে না। প্রশ্ন করবে কিন্তু অশ্

সুশিক্ষিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও নৈতিকতাসম্পন্ন জাতি গঠনে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা এবং আদর্শ শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। একটি জাতির চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও নৈতিক মানদণ্ড মূলত গড়ে ওঠে শিক্ষকের হাত ধরেই। অথচ বর্তমান সমাজবাস্তবতায় এই মৌলিক সত্যটি আজ বড়ো ধরনের সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

 শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাবোধ হ্রাসের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি সমাজকে এক বিপজ্জনক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বহুমুখী সংকটের গভীর বিশ্লেষণ এবং উত্তরণের পথ অন্বেষণ করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড়ো নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা।

যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন ছাড়া আধুনিক বিশ্বের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলানো অসম্ভব। চিরাচরিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং সনদসর্বস্ব মূল্যায়ন পদ্ধতি আজ এক প্রকার স্থবিরতা তৈরি করেছে। 

Advertisement

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে শিক্ষাকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রায়োগিক দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সাজাতে হবে। যে শিক্ষাব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীকে কেবল জীবিকা অর্জন শেখায়, কিন্তু মানুষ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ হতে শেখায় না, তা কখনো একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে না।

শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দিয়ে একজন আদর্শ শিক্ষককে মাপা যায় না। জ্ঞান, চরিত্র, ধৈর্য, মানবিকতা এবং শিক্ষাদানের দক্ষতাবিশিষ্ট প্রকৃত শিক্ষকরাই পারেন একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দিতে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব, যাতে তারা কোনো ধরনের আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়া মেধার সেরা অংশটুকু শ্রেণিকক্ষে ঢেলে দিতে পারেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অন্যতম গভীর অসুস্থতা হলো বাণিজ্যিক কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর সংস্কৃতি। শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ মনোযোগে পাঠদান না করে শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করার এই বৈপরীত্য শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই বাণিজ্যিকীকরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা প্রয়োজনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষকদের সম্মানজনক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এই অবক্ষয়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে এক ভয়ংকর প্রবণতা হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে 'মব জাস্টিস' বা দলবদ্ধ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। শিক্ষকের কোনো ভুলত্রুটি বা অপরাধের অভিযোগ উঠতেই পারে, কিন্তু সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব ছাত্র বা জনতার নয়।

সমাজ বা রাষ্ট্রে আইন, প্রশাসন এবং আদালত রয়েছে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য। অভিযোগ ওঠা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; যথাযথ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে নিজেই বিচারকের আসনে বসে যাওয়া কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

একইভাবে, শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার এবং যুক্তিবাদী হওয়ার সুযোগ দিতে হবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার লাইসেন্স হয়ে না দাঁড়ায়। শৃঙ্খলা রক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনোভাবেই প্রশ্রয় না পায়।

পরিশেষে বলা যায়, একটি শিক্ষিত, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের আন্দোলন শুরু হতে হবে শিক্ষক গড়ার মধ্য দিয়েই। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল ভালো ফল অর্জন বা চাকরির সনদ পাওয়া নয়, বরং এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা—যারা শিক্ষিত হবে কিন্তু অহংকারী হবে না। প্রশ্ন করবে কিন্তু অশ্রদ্ধা করবে না। অধিকার জানবে কিন্তু দায়িত্ব ভুলবে না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না।

শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে পরম যত্নে এবং আইনের শাসন বজায় রাখতে হবে সমান দৃঢ়তায়। শিক্ষক হোন কিংবা ছাত্র—অপরাধের বিচার করবে একমাত্র রাষ্ট্র ও আইন। এই ভারসাম্যপূর্ণ ও যুক্তির পথ ধরেই গড়ে উঠবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত আলোকিত সমাজ।

লেখক : হারুন-অর-রশীদ খান, প্রাবন্ধিক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!