পরিসংখ্যানটি পড়ার পর প্রথম যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, সেটা হলো- আমরা কোথায় যাচ্ছি!
প্রতিদিন গড়ে একজনের বেশি মেয়েশিশু ও নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আর ধর্ষণের শিকারদের বড় অংশ হচ্ছে শিশু। যে বয়সে একজন মেয়েশিশুর নিরাপদে স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলাধুলা করার কথা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই সে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এই বাস্তবতা কোনো সভ্য সমাজের জন্য শুধু লজ্জার নয়, গভীর আতঙ্কেরও।
.png)
আরও ভয়ংকর হলো, এই সংখ্যা সম্ভবত পুরো চিত্র নয়। মহিলা পরিষদের হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমে না আসা অসংখ্য ঘটনা এই হিসাবের বাইরে। সামাজিক লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ, প্রভাবশালী অপরাধীর হুমকি কিংবা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় কত ঘটনা যে প্রকাশই পায় না, তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব আমাদের নেই। ফলে ৫৫ ও ৫৪- দুটি সংখ্যা আমাদের বাস্তবতার ন্যূনতম চিত্রও হতে পারে।
অন্য একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণেও আগস্টের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার নথিভুক্ত ঘটনা বেড়েছে। শিশু ও নারী হত্যার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার- শিশু ও নারীর ওপর সহিংসতাকে আমরা যদি কেবল ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’ হিসেবে দেখি, তাহলে সমস্যার গভীরতা ধরতে পারব না। কারণ ধর্ষণ বা হত্যা হঠাৎ করে ঘটে না। এর পেছনে থাকে অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয় না থাকা, ভুক্তভোগীকে দুর্বল ভাবার সামাজিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মেয়েশিশু ও নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি এবং অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।
অপরাধী যখন মনে করে, অপরাধ করার পর রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ, সামাজিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার জোরে সে পার পেয়ে যেতে পারে, তখন আইন কাগজে যত কঠোরই হোক, তার কার্যকারিতা কমে যায়। আইনের ভয় তৈরি হয় আইনের কঠোরতায় নয়, আইনের নিশ্চিত প্রয়োগে।
তাই এখন শুধু ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ বলা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো- মামলা হওয়ার পর তদন্ত কত দ্রুত হচ্ছে? তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ? ভুক্তভোগী ও সাক্ষীরা কতটা নিরাপদ? অভিযোগপত্র দিতে কত সময় লাগছে? বিচার শেষ হতে কত বছর লাগছে? এবং শেষ পর্যন্ত কতজন অপরাধী সত্যিই শাস্তি পাচ্ছে?
একটি ধর্ষণের ঘটনার পর আমরা প্রায়ই দেখি- ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ প্রতিবাদ করে, মানববন্ধন হয়, অপরাধী গ্রেপ্তার হয়। তারপর কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনা আগের ঘটনাটিকে আড়াল করে ফেলে। এভাবেই অপরাধের সঙ্গে আমাদের সামাজিক স্মৃতিও ছোট হয়ে আসছে। একটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত আরেকটি নতুন ঘটনার ‘আগের খবর’ হয়ে যাচ্ছে।
এই স্বাভাবিকীকরণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যে সমাজে ধর্ষণ ও নারী হত্যার খবর নিয়মিত হয়ে যায়, সেখানে শুধু অপরাধীই বিপজ্জনক নয়, অপরাধের সঙ্গে সমাজের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াটাও বিপজ্জনক।
বিশেষ করে মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের মধ্যে ৩৬ জন মেয়েশিশু- এই একটি সংখ্যা আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। শিশুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। তারা অপরাধীর ক্ষমতা বা প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের।
একই সঙ্গে অপরাধের তথ্য সংগ্রহেও বড় পরিবর্তন দরকার। বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করছে। ফলে প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন। শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার একটি জাতীয়, সমন্বিত ও নিয়মিত ডেটাবেস থাকা জরুরি। কতটি অভিযোগ হলো, কতজন গ্রেপ্তার হলো, কতটি মামলায় অভিযোগপত্র হলো, কতটির বিচার শেষ হলো এবং কতজন দণ্ডিত হলো- প্রতিটি ধাপের তথ্য জনসমক্ষে থাকা উচিত। কারণ অন্ধকারে থাকা তথ্য দিয়ে কার্যকর নীতি তৈরি করা যায় না।
সবচেয়ে জরুরি হলো অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকে বিবেচনা করা। অপরাধী যে-ই হোক- ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী, ধনী, রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কিংবা সাধারণ মানুষ- আইনের কাছে তার পরিচয় একটাই: সে একজন অপরাধী।
আমরা মেয়েশিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু নিরাপত্তা শুধু বক্তৃতা, বিবৃতি কিংবা পোস্টারে নিশ্চিত হয় না। নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় যখন একজন মেয়েশিশু জানে, তার সঙ্গে অন্যায় হলে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে; একজন নারী জানেন, তাকে আক্রমণ করলে অপরাধী পালিয়ে যেতে পারবে না; আর একজন অপরাধী জানে, তার কোনো পরিচয়ই তাকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করবে না।
আগস্টের ৫৫টি হত্যা এবং ৫৪টি ধর্ষণ তাই আমাদের সামনে একটি কঠিন আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় শুধু অপরাধীর মুখ দেখা যাচ্ছে না; দেখা যাচ্ছে আমাদের আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, সামাজিক উদাসীনতা এবং বিচার পাওয়ার দীর্ঘ পথও।
প্রশ্নটি তাই শুধু- আগস্টে কতজন মেয়েশিশু ও নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই সংখ্যা দেখেও আমরা কতটা বদলাব?
কারণ পরের মাসে যদি আমরা আবার নতুন সংখ্যা গুনি, নতুন শিরোনাম লিখি, নতুন বিবৃতি দিই- কিন্তু অপরাধীর মনে শাস্তির ভয় তৈরি করতে না পারি, তাহলে একদিন ৫৫ কিংবা ৫৪ সংখ্যাও আমাদের কাছে আর ভয়ংকর মনে হবে না।
সেদিনই হবে সবচেয়ে বড় বিপদ।
আমরা কোথায় যাচ্ছি- এই প্রশ্নের উত্তর পরিসংখ্যান দিচ্ছে। এখন রাষ্ট্র ও সমাজকে ঠিক করতে হবে, আমরা কোথায় যেতে চাই।
লেখক : দীপু মাহমুদ, সমাজ চিন্তক, কথাসাহিত্যিক ও শিশু অধিকার বিষয়ক লেখক