৮০০ টাকা বেশি দামেও মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়েও মিলছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডার। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরবরাহ সংকটের অভিযোগের মধ্যেই রোববার নতুন করে দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিইআরসি)। ফলে রান্নার গ্যাস নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। নতুন দাম ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। গত মাসে একই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ সরবরাহ সংকটের সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির খবর পাওয়া গেছে।
রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও লালখান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সরবরাহ থাকলেও নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না এলপিজি সিলিন্ডার। চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, দুই সপ্তাহ আগে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় যে সিলিন্ডার কিনেছেন, এখন সেটিই কিনতে হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকায়। নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, প্রকাশ্যে এলপিজি সিলিন্ডার বেশি দামে বিক্রি হলেও কার্যকর কোনো নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামের এক সরবরাহকারী জানান, সকালে একটি ব্র্যান্ডের কিছু সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতা বেশি দাম দিতে রাজি থাকলেও সরবরাহ না থাকায় তাদের দেওয়া সম্ভব হয়নি। বহদ্দারহাটের এক বিক্রেতা বলেন, ডিলারদের কাছ থেকেই পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনেও অনেক সময় ভাউচার পাওয়া যাচ্ছে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল প্রায় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন বা ৩৩ শতাংশ।
এলপিজির প্রধান উপাদান বিউটেন ও প্রোপেনের আমদানিও বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিউটেন আমদানি হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার ৬৭২ টন, যা চলতি বছরে বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫৮ টন। প্রোপেন আমদানি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৭৩ টন।
এলপিজি আমদানি ও সরবরাহকারীদের সংগঠন লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও কিছু এলাকায় সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের এলপিজি কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা হচ্ছে কি না এবং নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। বিইআরসি আমদানিকারকদের কাছ থেকে দৈনিক আমদানি ও সরবরাহের তথ্য চেয়েছে। কেউ এলপিজি মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতিও এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে দেশে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে বাসাবাড়ি ও শিল্পে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে।
এদিকে চলতি বছরের শুরু থেকেই এলপিজির দামে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। জানুয়ারিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। অক্টোবরের নতুন দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা—১০ মাসে বেড়েছে ৫৩১ টাকা বা প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বাজারে অভিযান জোরদার করেছে। ৩ অক্টোবর দেশের ১৬ জেলায় ২৩টি দল অভিযান চালিয়ে ৩৯ প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট, অযৌক্তিক মজুত ও নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া থেকে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে।
তবে সংকটের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। আমদানি স্বাভাবিক থাকার পরও কেন খুচরা বাজারে সিলিন্ডার মিলছে না, কোথায় সরবরাহ আটকে আছে এবং কেউ মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না—এসবের উত্তর যেন মিলছে না। এর মধ্যে নতুন দাম কার্যকর হওয়ায় ভোক্তাদের আশঙ্কা বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আগেই বাড়তি দামের চাপ তাদের ঘাড়ে পড়বে।