মৎস্য চাষে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ‘সাকার ফিশ’
অ্যাকুরিয়ামের শোভা বাড়ানো এবং কাচে জন্মানো শ্যাওলা পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে দেশে সাকার ফিশ আমদানি করা হয়েছিল। যার বৈজ্ঞানিক নাম হিপোসটোমাস প্লেকোসটোমাস। বর্তমানে অ্যাকুরিয়ামের এ মাছ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন নদ-নদী এবং জলাশয়েও। জলজ বাস্তুসংস্থান ও দেশি মাছের অস্তিত্বের জন্য ভয়ানক হুমকি হয়ে উঠেছে এ মাছ।
গবেষকরা বলছেন, সাকার ফিশ প্রচুর খাবার খায়। প্রজনন ক্ষমতা বেশি তাই দ্রুত বংশ বিস্তার করে। জলজ পোকামাকড়, শ্যাওলা, ছোট মাছ এবং মাছের পোনা সাকার ফিশের প্রিয় খাবার। এ মাছের পাখনা খুব ধারালো হওয়ায় এর আঘাতে সহজেই অন্য মাছের দেহে ক্ষত হয় এবং পরে পচন ধরে মারা যায়।
ফলে মাছ চাষিদের কাছে আতঙ্কের নাম সাকার ফিশ। বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হওয়া
.png)
পুকুর বা ঘেরে সাকার ফিশ থাকলে উৎপাদন অনেক কমে যাবে। তাই এ মাছটিকে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে এর বিকল্প ব্যবহার নিয়ে ভাবছেন গবেষকরা।

মহাবিড়ম্বনার এই সাকার ফিশ যেভাবে জলাশয় থেকে কমিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) একদল গবেষক। গবেষক দলের প্রধান ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব বলেন, ‘খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট ও বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করার মাধ্যমে জলাশয়ের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া দ্রুত বংশবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সাকার মাছ জলাশয়ের পাড় ধ্বংস, দেশীয় প্রজাতির মাছের ডিম ও রেণু ভক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করাসহ নানা ক্ষতি করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, এর দেহে শতকরা ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ পর্যন্ত আমিষ রয়েছে। তাই দেশের সাধারণ মানুষ এই মাছটি খেতে পারবে কিনা বা খেলে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে কিনা, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। মাছটি খাওয়ার যোগ্য হলে সঠিক প্রচার ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে এর চাহিদা তৈরি করা যেতে পারে। খাদ্য হিসেবে গৃহীত হলে এটি একদিকে যেমন আমিষের চাহিদা পূরণ করবে, অন্যদিকে এর চাহিদা তৈরি হলে সাধারণ জেলে ও মাছ চাষিরা এটি আহরণ ও বিক্রি শুরু করবে। ফলে অযাচিত এ মাছ কমে আসতে থাকবে।’
সাকার ফিশের ক্ষতিকর প্রভাবে ভারত, মিয়ানমারসহ আরো অনেক দেশের মৎস্য চাষিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে আসা সাকার প্রজাতির মাছটি ১৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। মাছটি পানি ছাড়াও প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দিয়েছে যে, এ মাছ যাতে কোনোভাবেই উন্মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে মনিটরিং করা হোক। অধিদপ্তর এ মাছটি চাষ ও উন্মুক্ত জলাশয়ে পাওয়া গেলে তা নষ্ট করার নির্দেশনাও দিয়েছে।

অধ্যাপক হাবীব জানান, মাছটি যেহেতু বুড়িগঙ্গা নদীর পানির মতো বিষাক্ত পানিতে বেঁচে থাকতে পারে, তাই এটি নিয়ে আরো বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে তারা গবেষণা করছেন। গবেষণায় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না মেলা পর্যন্ত এ মাছ খাওয়া ঠিক হবে না। মাছটি যেন আর আমদানি না করা হয় বা দেশে এর কৃত্রিম প্রজনন যেন ঘটানো না হয়, সে বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অ্যাকুরিয়ামে লালনের জন্য বিদেশি মাছ আমদানির ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।
গবেষক এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মাসুদ রানা বলেন, সাকার ফিশ শুঁটকি করে এর গুঁড়া পোলট্রি বা মৎস্য শিল্পে ব্যবহৃত খাদ্যে আমিষের উৎস বা ফিশ মিল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে এর পরিমাণ জলাশয়ে ক্রমে কমে আসবে।