ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

ট্রাম্পির চিরবিদায়

সিকৃবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৩৬, ১৮ ডিসেম্বর ২০২২
ট্রাম্পির চিরবিদায়
চিরবিদায় নিয়েছে ট্রাম্পি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কুকুর হয়েও জয় করে নিয়েছিল সবার মন। প্রভু ভক্ত এই প্রাণীটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার কাছে বেশ বিশ্বস্ত ছিল। ছয় বছর বয়সে মৃত্যু হলো ওর। বলছিলাম, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) শিক্ষার্থীদের সুখ-দুঃখের সাথি ট্রাম্পি নামক কুকুরটির কথা। ২০১৬ সাল জন্ম ট্রাম্পির। প্রতিবছর ২৮ ডিসেম্বর ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা বেশ ঘটা করেই তার জন্মদিন পালন করতেন। এবার সপ্তম জন্মদিন পালনের আগেই চিরবিদায় নিয়েছে ট্রাম্পি। 

দীর্ঘ ছয় বছর ধরে আদরে আর ভালোবাসায় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১ একরে বড় হয়েছে ট্রাম্পি। প্রাণীর প্রতি মানুষের ভালোবাসার অনন্য এক দৃশ্য রেখে গেছে ট্রাম্পি। ট্রাম্পির বেড়ে উঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ এ এম এস কিবরিয়া হলে। ২০০৬ সাল থেকেই একটু একটু করে সবার মধ্যে নিজের জায়গা তৈরি নেয় ট্রাম্পি।

প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে ক্লাসে যেত ট্রাম্পি। সবাই ক্লাস যখন করত তখন সে বসে থাকত বারান্দায়, আবার ক্লাস শেষে সবার সঙ্গে বের হত। ট্রাম্পির সঙ্গে মেশার পর ক্যাম্পাসের অনেকের কুকুরের প্রতি ভীতি অনেকটাই কেটে গিয়েছে। কেউ ট্রাম্পি বলে ডাকলেই তার কাছে ছুটে আসত সে। গায়ে একটু হাত বুলালেই অবুঝ প্রাণীটি কোলে চড়ে বসত, যেখানে জয় হয়েছে বন্ধুত্বের আর ভালবাসার। 

Advertisement

ট্রাম্পির মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ট্রাম্পির আবেগঘন মূহুর্ত ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে।

 ট্রাম্পির ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কৃষি অনুষদের স্নাতক শিক্ষার্থী লিমন হাসান ট্রাম্পির মৃত্যুতে বলেন, আজ কিছুক্ষণ আগে ট্রাম্পি মারা গেছে, যার সঙ্গে সখ্যতা ছিল না এমন মানুষ ক্যাম্পাসে কমই আছে। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে হলের ছাদ সব জায়গায় ছিল তার বিচরণ। ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে বন্ধুরা ঘুরতে আসলে ট্রাম্পিকে ডেকে তার গল্পটা হয়তো আর বলা হবে না বলে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী জয়নাল জয় স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ২০১৬-১৭ সেশন চলে। আমাদের ব্যাচটা মাত্রই গণরুমে পা রাখল। তখন শাহ এ. এম. এস. কিবরিয়া হলের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় তার একটি ছোট্ট ঘর ছিল, আমাদের কিছুদিন আগেই সে হলে আসে কিছু সিনিয়র ভাইদের মাধ্যমে।
নিয়মিত তার যত্ন, খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসা সবকিছু হতো, মাঝখানে সে কয়েকবার বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় এবং অসুস্থতা চিকিৎসার মাধ্যমে কাটিয়ে উঠে। 

এক নামে ট্রাম্পি বলে ডাক দিলে যেখানেই থাকতো চলে আসতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার মনে জায়গা করে নিয়েছিল ট্রাম্পি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আনাচে-কানাচে তার  চলাফেরা ছিল। হলের প্রত্যেকটি মানুষের সঙ্গে তার এক ধরনের আবেগ জড়িয়ে আছে।

এবার সপ্তম জন্মদিন পালনের আগেই চিরবিদায় নিয়েছে ট্রাম্পি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

এছাড়াও ট্রাম্পির ছবি আর তার গলায় ঝুলানোর জন্য সুদূর আমেরিকা থেকে কেনা   বেল্ট এর ছবি ট্রাম্পির ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয়েছে। পোস্টে লিখা রয়েছে, আমি ট্রাম্পি, আমি গতকাল রাত থেকে কষ্ট পেয়ে আজকে সকালে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিইসি বিল্ডিং এর সামনে মরে গেলাম। গত ৬টা বছর ধরে তোমাদের সঙ্গে কতশত ক্লাস, পরীক্ষা, আড্ডা, অনুষ্ঠানে ছিলাম। তোমরা মাঝে মাঝে আমাকে সহ্য করতে না পারলেও, লাঠি দিয়ে পিটালেও, কোনদিন তোমাদের কাউকে কামড় দেইনি। আমি খুব করে চাইতাম অনেকদিন বেচে থাকতে। কিন্তু তোমরা আমাকে আরো ছয়টা মাস বাচায় রাখতে পারোনি। আমি তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। 

আমার আগের বেল্টটা কেউ একজন খুলে নিয়ে গিয়েছে। তাই কিছুটা কম দাম দিয়ে আরেকটা বেল্ট আমেরিকায় আমাজন থেকে কিনা হয়েছিল। ২৮ ডিসেম্বর, আমার জন্মদিনের দিন বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। সেটাও গলায় ঝুলিয়ে তোমাদেরকে দেখানো হলো না। হয়তো এইটাই আমার শেষ লিখা তোমাদের জন্য। তোমরা মনে রেখ আমাকে। খুব ভালোবাসতাম সবাইকে।

ট্রাম্পি নিজেকে যেমন ভালোবাসার পাত্র হিসেবে প্রমাণ করেছে, তেমনি সিকৃবি শিক্ষার্থীরাও প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এভাবেই যুগে যুগে নাগরিক যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি নিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভালোবাসায় মানুষ নিজেকে নিয়োজিত করবে এমনটাই প্রত্যাশা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!