ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩

[ শিক্ষা ]

দুই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের উত্তপ্ত পুরো বরিশাল

জাকির হোসেন, ববি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৪৩, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪
দুই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের উত্তপ্ত পুরো বরিশাল
ছবি: সংগৃহীত

রাতভর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) ও ব্রজমোহন কলেজের (বিএম) শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ১০০ এর বেশি জনের মত আহত হয়েছে। আহতদের শের-ই-বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে (শেবাচিম) ভর্তি হয়েছেন। এদিকে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা সমাধানে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের পক্ষ থেকে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে সরকারি ব্রজমোহন কলেজে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিরাপত্তায় বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বিএম কলেজ অনেক পুরাতন ও বড় বিদ্যাপীঠ হওয়ার কারণে এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে আছে সমগ্র বরিশালে। সেসব সাবেক শিক্ষার্থীরা এ ঘটনায় উত্তপ্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়ে ক্ষোভের মনোভাব প্রকাশ করেছেন।  

মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে বটতলা ও ব্রজমোহন কলেজ ক্যাম্পাসে এই ঘটনা ঘটে। 

ঘটনার সূত্রপাত নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডের বাসিন্দা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনুভা চৌধুরী জোয়ার পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে পার্শ্ববর্তী পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ নিয়ে। সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) রা‌তে বিএম কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী বিরোধ নিরসনে তাসনুভার বাসায় গেলে সেখানে কথা কাটাকাটি হয়। তাসনুভা এ সময় ফোনে ববি শিক্ষার্থী তার বন্ধুদের জানালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩০/৪০ জন সেখানে যায়। মা এবং তাকে হেনস্তা অপমান করা হয়েছে বলে তাসনুভা তাদেরকে জানালে তারা সংখ্যায় কম থাকা বিএম কলেজ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর ও কয়েকজনকে আহত করে। পরে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে চলে আসে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা নগরের বিভিন্নস্থানে ববি শিক্ষার্থীদের খুঁজতে থাকে। সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতের ঘটনায় বিএম কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান রাফি আহত হন। তিনি নিজেকে বিএম কলেজের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক বলে দাবি করেন।

এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ১০০ এর বেশি জনের মত আহত হয়েছে। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পরে মোস্তাফিজুরের ওপর হামলার অভিযোগ এনে মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বটতলায় ববির দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে ববি শিক্ষার্থীরা একটি বাসে করে ঘটনাস্থলে গেলে নগরীর বটতলা এলাকায় ববির ‘আগুন মুখা’নামে একটি বাসে শিক্ষার্থীদেরকে ভিতরে রেখেই অতর্কিত হামলা চালায় বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বাসে মধ্যে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে আহত হয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে (শেবাচিম) ভর্তি হয়েছেন। এই হামলার পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিএম কলেজের দিকে ট্রাক, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে অগ্রসর হয়। এক পর্যায়ে বিএম কলেজ এলাকায় এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ-ধাওয়া পালটা ধাওয়া চলে। এতে অনন্ত দুই পক্ষের ১০০ জনের ও বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদেরকে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় ববির একটি বাসে ভাঙচুর চালায় বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। এরপর ববি শিক্ষার্থীরা বিএম কলেজ এলাকায় এসে কলেজের তিনটি বাস ভাঙচুর করে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হয়ে রাত ৩টা পর্যন্ত চলে হামলা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সোমবার রাতে নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনুভা চৌধুরী জোয়া-এর পরিবারের বিরোধীয় বাড়ি দখল করতে হুমকি ও দুই নারীকে হেনস্তা করে বিএম কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান রাফি। পরে ববি শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে হাজির হলে দুই পক্ষের মধ্যে কথার কাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়। এরপর মঙ্গলবার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ববির দুই সহপাঠীকে মারধর করে বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনটি বাসে চড়ে ববি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে নগরীর বটতলা এলাকার দিকে রওনা দেন। একটি বাস বটতলা এলাকায় পৌঁছানোর পথে শিক্ষার্থী বোঝাই বাসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এসময় ২৫ জন ববি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। তাদেরকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে৷

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনামুল বলেন, আমরা সমাধানের উদ্দেশ্যে বটতলায় গেলে বিএম কলেজের কিছু উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে বাসে রেখেই অতর্কিত হামলা চালায় ও ভাঙচুর চালায়। এতে অনেক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে মেডিকেলে ভর্তি। পরে এসব বিষয়ে কথা বলতে কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। তারা আমাদের দেখেই হামলা চালায়। আমাদের অনেকে আহত হয়েছেন।

বিএম কলেজ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের সমন্বয়ককে মারধর করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের ওপর হামলা চালিয়ে অসংখ্য বিএম কলেজ শিক্ষার্থীদের আহত করা হয়েছে। লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে তিনটি বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তারা আরো জানান, মধ্যরাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাস ও একটি ছোট ট্রাকভর্তি শিক্ষার্থীরা এসে আমাদের ক্যাম্পাসে হামলা চালায়। যাকে যেখানে যেভাবে পেয়েছে পিটিয়ে আহত করেছে। অনেকের মাথা ফেটেছে, অনেকে মারাত্মক জখম হয়েছেন। এছাড়াও বাসসহ ক্যাম্পাসে ভাঙচুর করেছে। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সোমবার রাতে বিএম কলেজ সমন্বয়ক মোস্তাফিজুর রহমান রাফিকে মারধর করে ববি শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার পর মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বটতলা এলাকায় অবস্থানকালে দুইজন ববি শিক্ষার্থীকে মারধর করে বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। আহত দুই ববি শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। দুই ববি শিক্ষার্থীদের মারধরে খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই গ্রুপের মধ্যে হামলা ও ধাওয়া পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় পরিস্থিতি সান্ত করার জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ একসঙ্গে কাজ করেছেন।

শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ৮২ জনকে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের অবস্থা গুরুতর নয়।
বিএম কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক বলেন, তিনটি বাস, প্রশাসনিক ভবন, হোস্টেল ও কলেজের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর হয়েছে। কতজন ছাত্র আহত হয়েছেন, তা এখনো জানতে পারিনি।

আহতরা শের-ই-বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে (শেবাচিম) ভর্তি হয়েছেন।

এদিকে বুধবার ভোরে এ ঘটনায় বিএম কলেজ এলাকায় ববির ৬ শিক্ষার্থী আটকা পরলে তাদের মুচলেকা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাসে ছাড়িয়ে নেয় বর্তমানে ববির প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীন।

প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে বিরোধপূর্ণ একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে। এ সময় দুপক্ষের হাতাহাতিতে নারীসহ পাঁচজন আহত হয়েছে। গত সোমবার রাত ১১টার দিকে নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডে বাড়ি দখলের চেষ্টার সময় হাতাহাতির এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষার্থী তাসনুভা চৌধুরী জোয়া। এঘটনায় জোয়া একটি সাধারণ ডায়েরি ও করেন থানায়। পরে এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে স্ব স্ব ক্যাম্পাসের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ববি এবং বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থীরা। 

তবে উভয় প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু শিক্ষার্থীরা মনে করছেন এর মধ্যে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। তৃতীয় পক্ষ প্রবেশ করে তাদের (শিক্ষার্থীদের) মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন তারা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: বরিশাল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!