ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ বিনোদন ]

গ্রামবাসী গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ মনির খানকে মেরেছিলেন

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০০:২৬, ২০ অক্টোবর ২০২৬
গ্রামবাসী গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ মনির খানকে মেরেছিলেন
ছবি: সংগৃহীত

এসএসসি পরীক্ষার পর অবসর সময়ে বাবার কেনা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করার কারণে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মনির খান ও তার বাবাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছিলেন তাদেরই গ্রামের কয়েকজন। মাছরাঙা টেলিভিশনকে দেওয়া ভিডিও সাক্ষাৎকারে মনির খান ভয়াবহ সেই স্মৃতি তুলে ধরেন।

মনির খান বলেন, ‘নিজের বাড়িতে গান গাওয়ার অপরাধে আমার নামে কমপ্লেইন করেছিলেন এক হুজুর। গান গাওয়ার অপরাধে আমার নামে ৭-৮টা মামলা করা হয়েছিল। সে সময় আমাকে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হতো।’

একই সাক্ষাৎকারের দুটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছে মাছরাঙা। দ্বিতীয় ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার হারমোনিয়াম ভাঙার জন্য বাড়িতে লোক আসে। আমাকে পেটাতে থাকে। এ সময় আমি হারমোনিয়াম জড়িয়ে থাকি। বাবাও হারমোনিয়াম আর আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেন। বাবা পিঠে আঘাত পান।’

মনির খান বলেন, ‘আমাদের হুজুর এসে কমপ্লেইন করতেন। একটা পর্যায়ে তো খুব সমস্যাই হলো। আমার নামে প্রায় সাত-আটটা মামলাও করা হয়েছিল। আমাকে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছে শুধু গান গাওয়ার অপরাধে। জামিন নিয়েছি কাঠগড়ায় গান গেয়ে। কাঠগড়ায় গান গাওয়ার পর জজ সাহেব আমাকে বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন।’

২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাবা মাহবুব আলী খানকে হারান কণ্ঠশিল্পী মনির খান। বাবার স্মৃতি নিয়ে মনির খান বলেন, ‘বাবা খুব হিসেবি মানুষ ছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপই হিসেব করে নিতেন। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। আমাদের ছোটবেলা থেকেই সব বিষয়ে সুশৃঙ্খল নির্দেশনা দিতেন। আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, ফলাফল পেতে তখন তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের মতো সময় লাগত। তখন বয়সও অল্প, মন-মানসিকতা নিয়ন্ত্রণে থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে না জেনেবুঝেই প্রথম হয়ে যেতাম। তখন বাবা মনে করলেন, আমাকে গানের দিকে দেওয়া যায় কি না। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই বাবা বললেন, চলো, একটা হারমোনিয়াম কিনে নিয়ে আসি। প্রতিটি সন্তান তার বাবা-মাকে নিয়ে অনেক কথা বলতে পারবে। আমি শুধু বাস্তবটুকু বলছি। হারমোনিয়াম কিনতে গেলাম ১৭ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে।’

মনির খান বলেন, ‘তার (বাবার) আদর্শিক বিষয়গুলো আমাদের কীভাবে দিকনির্দেশনা দিতেন, কোন কাজ কীভাবে করা প্রয়োজন, কখন পড়াশোনা করতে হবে, সবকিছুতেই তিনি খুব সুশৃঙ্খল ছিলেন। আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, তখন দীর্ঘ সময়ের বিরতি থাকত। তিন মাস সময় লাগত এসএসসির ফল পেতে। তখন বয়সও অল্প। মন-মানসিকতা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। দৌড়ঝাঁপ করি। তখন তিনি (বাবা) চিন্তা করলেন, এ তো ভালো গান করে। তার মনে স্বপ্ন জাগল, হয়তো কখনো সুযোগ পেলে এই ছেলেকে এদিকে কিছু করানো যায় কি না।’

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তো যা হোক, সেখানেও তো অনেক ঘাত-প্রতিঘাত। বাবার সম্মানের হানি, বিভিন্নভাবে সামাজিক বাধা, ধর্মীয় বাধা। তিনি একটা কথাই বললেন, ওর প্রতিভা, যেটা আল্লাহপাক ওকে দিয়েছেন, সেটাকে প্রকাশ করার জন্য বা বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যত রকম বাধাই আসুক, আমি তা অতিক্রম করবই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাবা বলেছিলেন, আমার একটাই চাওয়া। তোমার কাছে তোমার বাবার যে চাওয়াটা আছে, সেটা পূরণের চেষ্টা করবে। এর জন্য যা লাগে, আমি করব। তো যখন পুরোনো বাড়িতে আমাদের মসজিদের পাশে বাড়ি ছিল, তখন ঝামেলা হতো। আমাদের হুজুর এসে একটু কমপ্লেইন করতেন।’

সেই সময় মামলা থেকে কীভাবে জামিন পেয়েছিলেন, সেই ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাঠগড়ায় গান গাওয়ার পরে উনি (জজ সাহেব) আমাকে বেকসুর খালাস দিলেন। সেটা অনেক লম্বা ইতিহাস। আমি তখন গান শেখা শুরু করলাম। আমার প্রথম ওস্তাদ রেজা খোসরু।’

গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার স্মৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যখন গ্রাম ছেড়ে ঢাকা এলাম, তখন বাবার অনুভবটা আরও বেশি করতাম। আমি তার অভাবটা বুঝতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল, এমন একজন মানুষকে রেখে এসেছি, এখন তো আমি একা হয়ে গেলাম। কী করব ঢাকায়? বিশাল আকাশের নিচে মানুষ আর মানুষ। ঢাকা শহরে এত মানুষের মধ্যে আমি একজন। আমার ইচ্ছার মূল্য কে দেবে? আমি কার কাছে যাব?’

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!