ভোট আছে, নেই সেই দৃশ্য
একটি ত্রিপল, পলিথিন বা বাঁশ-বেতের ছাউনি টাঙিয়ে দেওয়া হতো গাড়িতে। রোদ-বৃষ্টিতে গ্রামের পর গ্রাম সেই গাড়ি ছুটে যেত নানা প্রয়োজনে। বাড়ির বউরা চলাচল করত এই গাড়িতে। বলছিলাম, গরুর গাড়ির কথা।
তখন দুই ধরনের গরু থাকত গৃহস্থের গোয়ালে। একদল মাঠে চাষ করত। আর দুটো গরুকে সবসময় জামাই আদর করে খেতে দেওয়া হত। গায়ে মাখানো হত সরষের তেল। দেখতে ছিল নাদুসনুদুস। গরু দেখেই বোঝা যেত কার বাড়ির মেয়েরা যাচ্ছে।
ভোটের দিনে বাড়ির মেয়েরা সাত সকালে উঠে রান্না করত। ঠিক দুপুরে ছই গাড়ি চেপে যেত ভোট দিতে। তখন বাঙালি মুসলমানের মধ্যে বোরকার প্রচলন ছিল। তারা বোরকা পরেই ভোট কেন্দ্রে যেতেন। ছই গাড়ি চেপে বনেদি বাড়ির হিন্দু মেয়েরাও যেতেন কেন্দ্রে। ভোট কেন্দ্রে অনেকেই মাটির হাড়ি ভরে ভাত-ডাল নিয়ে যেতেন। ঘরের পুরুষরা আগেই যেতেন কেন্দ্রে। তারাসহ অনেক অতিথিকেও খাওয়ানো হতো কেন্দ্রে বসেই।
.png)
এখন গৃহস্থের বাড়িতে গরু আর নেই বললেই চলে। গরুর বদলে এসেছে হ্যান্ড ট্রাকটর। ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। গরুর গাড়ির ছই উঠে মাঝখানে চালু হয়েছিল ভ্যান রিক্শায় ছই গাড়ি। আর এখন গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়িতে মোটরসাইকেল। গ্রামের রাস্তায় অটো -টোটো। একসময় যারা ভ্যান রিকশা চালাতেন তাদের অনেকই এখন টোটো চালাচ্ছেন।
আগে মানুষ ভোরে উঠে কাজে যেতেন। তারপর মাঠের কাজ সেরে ভোট দিতে যেতেন। এখন মানুষ মাঠেই যান সকাল ৮ টায়। তারপর ১২ টায় বাড়ি ফেরেন। তাই ভোটদানের জন্য কেন্দ্রে যাওয়ার সেই আগেকার চিত্র আর চোখে পরবে না এখন।
অনেক কিছু পাল্টেছে। গ্রামের কাঁচা রাস্তাটা পাকা হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বেড়েছে, তাই শহর কাছাকাছি এসেছে। শহর যত কাছাকাছি এসেছে ততই আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে গ্রামে। গত পাঁচ দশক আগেও ভোট কেন্দ্র ছিল অনেক দূরে দূরে। আর এখন ভোট কেন্দ্র বলতে এই যে ঘরের কাছেই। কারণ ভোট কেন্দ্র বেড়েছে। তাই গরুর গাড়ি তো দূরে থাক, কোনো যানবাহনই দরকার হয় না কেন্দ্রে যেতে।
হাতের মুঠোয়ে আজ স্মার্ট ফোন, ভোট দিয়ে ভোটররাই সেলফি তুলছে। আপলোড করে দিচ্ছে ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায়। মোবাইলের কারণে সহজেই আজ মানুষ জেনে যাচ্ছে। কোন কেন্দ্রে কেমন ভোট হচ্ছে। তবে আগেকার বিষয়গুলো কিন্তু এমন ছিল না। দিনের বেলায় ভোট দিয়ে ভোটাররা সারাদিন অপেক্ষায় থাকত, কে জিতল জানার জন্য।
ভোট দেওয়ার জন্য প্রার্থীরা এখন ভোটারদের ফোন করে, এসএমএস করে, ফেসবুক-টুইটার মার্কেটিং করে, ই-মেইল করে, তবে গত ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও প্রচারণার দৃশ্যপট ছিল অন্যরকম। তখন ভোটের প্রচারণার বাউল গায়কদের ভাড়া করা হতো। তারা নানা জায়গায় গানের আসর বসাতেন। গান গেয়ে প্রচারণা চালাতেন। লোকগান গাইতেন, এরপর ভোটারদের কাছে প্রর্থীর জন্য ভোট চাইতেন।
যত আধুনিকতা ছুঁয়েছে ততই মানুষের যেন আত্মিকতা কমেছে। বাউলরা একসময় বলতেন, ‘গাঁয়ের নওজওয়ান হিন্দু মুসলমান। আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ তবে এখন বুঝি সেই দৃশ্য হারিয়ে গেছে। আগেকার জয়-পরাজয়ে ছিল অন্য দৃশ্য। প্রার্থীরাই একে অন্যের গলায় মালা পরিয়ে দিতেন। পরাজিত প্রার্থী জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানাত। এখন সেই দৃশ্য আর নেই। এখন চারিদিকে অবিশ্বাস। শুধুই আমিত্ব। ভাইয়ে ভাইয়ে হিংসা, বিবাদ। শহর- গ্রাম সর্বত্র এই একই ছবি। এখন আর নেই সেই আগের ছবি। আর কি ফিরবে সেই দিনগুলো?