রাজধানী ঢাকার বেশ কিছু সুপারশপে জাপান থেকে আনা ব্ল্যাক রাইস বা কালো চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকা। তবে দেশীয় কালো চাল কিছু সুপারশপে বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা প্রতি কেজিতে।
বাংলাদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে অনেকেই শখ করে এই চাল কিনছেন। পরে ইন্টারনেট ঘেঁটে জেনেছেন ডায়াবেটিস রোগিদের জন্য এ চাল খুবই দরকারি। এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই অনেকেই কেনেন। এ চালের ভাতের স্বাদটা ঠিক রেগুলার যে ভাত খাওয়া হয় তার মতো না। একটু ভিন্ন।
.png)
প্রাচীন চীনে এই কালো চালের পরিচিতি ছিলো ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে এটি দীর্ঘায়ু ও কামোদ্দীপক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এ বিশেষ গুণের জন্য এটিকে সম্রাট ও তার পরিষদের লোকজন ছাড়া সর্বসাধারণের জন্য তা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেখানে পাহাড় এলাকাগুলোতে শুধু রাজা বা রাজন্যবর্গের জন্য এ ধরণের চাল গোপনে চাষ করা হতো। আবার কেউ কেউ বলেন তখন শুধু রাজপরিবারের মেয়েদের গোপনে এ চালের ভাত খাওয়ানো হতো। ফলে এটি নিষিদ্ধ চাল হিসেবে ঐতিহাসিক গল্পগাঁথায় উঠে আসে।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, এই ধানগাছের পাতা ও কাণ্ডের রং সবুজ হলেও ধান ও চালের রং কালো। তাই এ ধানের জাতটি কালো চালের ধান নামে পরিচিত। বীজ বপনের পর কোনটির পাতা সবুজ আবার কোনটির পাতা বেগুনি হলে চালের রং কালো হয়। এ কারণে কোথাও সবুজ আবার কোথাও বেগুনি রঙের ধানপাতা সমারোহে চমৎকার হয়ে ওঠে ধানক্ষেতগুলো। এই চালের ভাত আঠালো ও সুগন্ধি। পায়েস, খিচুড়ি, ঘি-ভাত, পাস্তা, পাঁপড়, নুডলস করেও খাওয়া যায়। তবে এ ধানের চালের দাম অনেক বেশি। ঢাকার বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কালো চাল এখন ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন ৫ থেকে ৭ প্রজাতির কালো চালের ধান চাষ হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটও কয়েক বছর ধরে এ ধান চাষ করছে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভারত, জাপান, চীন ও ভিয়েতনামে সাতটি দেশ থেকে সংগ্রহ করা কালো চালের বেগুনী ও সবুজ পাতার ধান এখন চাষ হচ্ছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে যার হাত দিয়ে কালো চালের ধান মাঠে এসেছে তিনি হলেন কুমিল্লা সদর উপজেলার মনাগ্রামের মনজুর হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে গ্রামে ফিরে পারিবারিক কারণে সেখানেই বসবাস করতে হয়েছে তাকে। এরপর থেকে পারিবারিক কৃষিকাজে সম্পৃক্ত হন।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ‘২০১৭ সালে একটি কাজে ঢাকার গুলশানে গিয়েছিলাম। একটি সুপারশপে দেখলাম জাপান থেকে আনা কালো চালের কেজি প্রতি দাম এক হাজার টাকা। তখনই মাথায় এলো। কিছু চাল কিনে আনলাম। এরপর কুমিল্লায় গিয়ে তিনি বের করার চেষ্টা করেন সুপারশপ থেকে কিনে আনা চালের কোন দানার মধ্যে জীবিত কোন উপাদান আছে কিনা অর্থাৎ এ চাল থেকে ধান বীজ তৈরি করা সম্ভব হবে কিনা।
তিনি বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করলাম। এবং শেষ পর্যন্ত ২৩টি ধান গাছ হলো। সেই শুরু। এরপর ড. মেহেদী মাসুদ ইন্দোনেশিয়া থেকে বীজ এনে দিলেন সে বছরই।

মেহেদী মাসুদের প্রকল্পের অধীনে আগে থেকেই কৃষক হিসেবে কাজ করতেন মনজুর হোসেন। মাসুদ ইন্দোনেশিয়ার বালি থেকে বারোমাসি জাতের কালো চালের ধানের বীজ আনার পর অফিসে যখন সেগুলো খোলেন তার সামনেই ছিলেন তখন মনজুর। পরে ত্রিপুরার একটি ধান গবেষণা কেন্দ্র থেকেও নিজ উদ্যোগে কালো চালের ধান সংগ্রহ করেন তিনি। এভাবেই শুরু হয়ে এ বছর প্রায় এক হাজার একর জমিতে কালো চালের ধানের চাষ হচ্ছে।
কুমিল্লা ছাড়াও নওগাঁ, চট্টগ্রাম, ঠাকুরগাঁওসহ কয়েকটি এলাকার কৃষকরা মনজুর হোসেনের কাছ থেকে এ ধান বীজ নিয়েছেন। তিনি ঢাকার কয়েকটি সুপারশপে এ চাল সরবরাহ করছেন কেজি দুশো টাকা দরে যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকায়।
কালো চালে অ্যান্থসায়ানিন বেশি থাকে যা একটি ক্যান্সার প্রতিরোধী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এতে ফাইবার অনেক বেশি থাকে। ফলে এ চালের ভাত শরীরে গ্লুকোজ তৈরি করে খুব ধীর গতিতে। ফলে শরীরে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ কারণে এ চালকে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব কার্যকর বলা হয়। এ ছাড়া আমিষ, ভিটামিন, জিংক, খনিজ পদার্থসহ অন্য উপাদানগুলো সাধারণ চালের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি থাকে।