ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

‘মুকুটহীন সম্রাট’ শিল্পী এস এম সুলতানের ৯৯তম জন্মদিন 

লে. কর্নেল সৈয়দ হাসান ইকবাল (অব.)
প্রকাশিত: ১৪:৫৫, ১০ আগস্ট ২০২২
‘মুকুটহীন সম্রাট’ শিল্পী এস এম সুলতানের ৯৯তম জন্মদিন 
ফাইল ছবি

বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্ম হয়েছিল ১০ আগষ্ট ১৯২৩ সালে নড়াইল জেলার সদর উপজেলার মাছিমদিয়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে। তার পারিবারিক ডাকনাম ছিল লাল মিয়া। এই শিল্পী জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলার গ্রামীণ জনপদের মাটি ও মানুষ তথা কৃষক, কৃষিকাজ ও প্রকৃতির মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকুলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তার শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। শিল্পীর চিত্রে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণ প্রাচুর্য্যের পাশাপাশি শ্রেণীর দ্বন্দ্ব ও গ্রামীণ অর্থনীতির রূপ অনেকটাই ফুটে উঠেছে। 

এস এম সুলতানের চিত্রে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসাবে গ্রাম বাংলার মহিমা, কৃষক ও প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দারিদ্রতা, শত বাধা থাকার পরেও ১৯২৮ সালে সুলতানের পিতা তাকে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। পাঁচ বছর পর থেমে যায় পড়াশোনা। এরপর বাবার সংঙ্গে রাজমিস্ত্র্রীর কাজ শুরু করেন। এভাবেই এসএম সুলতানের কর্ম জীবন শুরু। চলতে থাকে  নড়াইলের বিভিন্ন দালানে দালানে ছবি আঁকা। দশ বছর বয়সের স্কুল জীবনে, স্কুল পরিদর্শনে আসা ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ছবি এঁকে সবার তাক লাগিয়ে দেন। দরিদ্র ঘরের সুলতানের ইচ্ছে ছিল কলকাতায় গিয়ে ছবি আঁকা শিখবেন। এ সময় তার প্রতিভায় চমৎকৃত হয়ে স্থানীয় জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ১৯৩৮ সালে এস এম সুলতান কলকাতায় গমন করেন। সুলতানের শিক্ষার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার গ্রন্থাগারের দরজা উন্মুক্ত করে দেন।

Advertisement

আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার মতো সুলতানের সব ধরণের যোগ্যতা না থাকাসত্ত্বেও ১৯৪১ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। তিন বছর আর্ট স্কুলে পড়ার পর তিনি ফ্রিল্যান্স শিল্পীর জীবন শুরু করেন। কোলকাতা আর্ট স্কুলের বাঁধা-ধরা জীবন সুলতানের ভালো লাগেনি। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ও ভবঘুরে প্রকৃতির। সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিয়মনীতি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ছিলেন প্রকৃতি প্রেমী একজন আবেগী মানুষ। সেজন্য তিনি অস্বীকার করেছিলেন যান্ত্রিকতা, নগর ও নাগরিক জীবনকে। ১৯৪৩ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতের ‘খাকসার আন্দোলনে’ যোগ দিয়েছিলেন। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বেড়িয়ে পড়েন উপমহাদেশের পথে পথে ও প্রান্তরে প্রান্তরে। ছোট বড় শহরগুলিতে ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্যদের ছবি আঁকতেন। ছবি প্রদর্শনী ও ছবি বিক্রি করে চলত তার জীবন। শিল্পী  হিসেবে তিনি তখন কিছুটা পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

কিন্তু জাগতিক বিষয়ের প্রতি ছিল সুলতানের প্রচণ্ড অনাগ্রাহ। শিকড় ছড়াবার আগেই তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন। আর সেজন্য তখনকার আঁকা তার ছবির এমনকি ফটোগ্রাফও এখন আর নেই। তবে সে সময় তিনি নৈসর্গিক দৃশ্য ও প্রকৃতির ছবিও আঁকতেন। কাশ্মীরে কিছুদিন থেকে তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। সিমলায় ১৯৬৪ সালে তার আঁকা ছবি প্রথম প্রদর্শনী হয়। ১৯৪৭ ইং সনে ভারত-পাকিস্তান বিভাগের পর কিছু দিনের জন্য এস এম সুলতান জন্মস্থান নড়াইলে ফেরেন। কিন্তু এর পরই ১৯৫১ সালে তিনি করাচি চলে যান। সেখানে পারসি স্কুলে দুই বছর শিক্ষকতা করেন। সে সময় চঘুতাই ও শাকরে আলীর মত শিল্পীদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার পূর্বে ১৯৫০ সালে তিনি আমেরিকায় চিত্র শিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন এবং নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও পরে লন্ডনে তার ছবির প্রদর্শনী করেন। নড়াইলে তিনি নন্দন কানন নামের একটি প্রাইমারী ও একটি হাই স্কুল এবং একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের জন্য কিছু করার জন্য আগ্রহ থেকে তার শেষ বয়সে তিনি ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

এস এম সুলতান পঞ্চাশ দশকে ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর কাজ শুরু করেন। সে সময় শিল্পীরা উৎসাহ ও আগ্রহে বিভিন্ন কৌশল-রীতি, নিয়ম ও ছবির মাধ্যমসহ নতুন নতুন বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরীক্ষা নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সে সময়ও এস এম সুলতান সকলের চোখের আড়ালে নড়াইলেই রয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতেন কিন্তু তার জীবনের মূল সুরটি ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের ছন্দের সঙ্গে বাঁধা।

তার জীবনের মূল সুরটি ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের ছন্দের সঙ্গে বাঁধা

তিনি কৃষক পুরুষকে দিয়েছেন পেশীবহুল ও বলশীল দেহ। আর কৃষক রমণীকে দিয়ছেন সুঠাম ও সুঢৌল গড়ন, দিয়েছেন লাবণ্য ও শক্তি। হয়তো তার দেখা দুর্বল দেহী, ম্রিয়মাণ ও শোষণের শিকার কৃষকদের দেখে কল্পনায় তিনি নির্মাণ করেছেন শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান কৃষক সমাজ।

সুলতানের ছবিতে পরিপূর্ণতা ও প্রাণ প্রাচুর্যের পাশাপাশি ছিল শ্রেণী বৈষম্য, গ্রামীণ জীবণের কঠিন বাস্তবতার চিত্র। তার আঁকা চর দখল (১৯৭৬) ও হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এরকমই দুটি ছবি। তার সৃজনশীলতার শুরু থেকে ছবির মূল বিষয় ছিল প্রকৃতি। মধ্য পঞ্চাশের পর থেকে তার কাজে পরিবর্তন আসে। গ্রাম  বাংলার ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে  থাকেন। তার-ল্যান্ডস্কেপে এলো ফসলের জমি, বাংলার কৃষি জীবন এবং শ্রমজীবী মানুষ। ষাটের শেষে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে মূর্ত হতে থাকে। তার চিত্রকর্মের প্রধান উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠলো মানুষের দেহাবয়ব। পরে ল্যান্ডস্কেপের পরিবর্তে মানুষই হয়ে উঠে তার ছবির অধিপতি। 

পৃথিবীর ইতিহাসে মানব সভ্যতার যাত্রা শুরু হয় কৃষি কর্ম থেকে। আবাদ করা মানুষেরাই ভারতবর্ষে, চীন, মেসোপটেমিয়া,ব্যাবিলন সভ্যতার জয়ডঙ্কা বাজিয়ে ছিলেন প্রথম। সেখানেই ইতিহাস গতি পেয়েছে। ইতিহাস-নির্মাতা এই কর্মী কৃষকেরাই শেষ পর্যন্ত সুলতানের ছবির নায়ক। সুলতানের আঁকা মানুষেরা সেজন্য বাংলাদেশের হয়েও সমস্ত পৃথিবীর মানুষ। এ বিষয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘প্রকৃতি ফুটন্ত ইতিহাসের গভীরতম অঙ্গীকার যারা নিরবধিকাল ধরে বহন করে চলেছে, নতুন ফুটন্ত ইতিহাসের আবেগ-উত্তাপ সবটুকু পান করে ফুটে উঠবার বীর্য এবং বিকাশমান সৃষ্টিশীলতা যাদের আছে। সেই শ্রমজীবী কিষাণ জনগণকে তিনি বাংলার ইতিহাসের নবীন কুশীলব হিসেবে দেখতে পেয়েছিলেন। সুলতানের কৃষক নেহায়েত মাটির করুণার কাঙ্গাল ছিলেন না। সুলতানের কৃষকেরা জীবনের সাধনায় নিমগ্ন। তারা মাটিকে চাষ করে ফসল ফলায় নি। পেশী শক্তি দিয়ে প্রকৃতির সাথে সঙ্গম করে প্রকৃতিতে ফুলে-ফসলে সুন্দরী সন্তানবতী হতে বাধ্য করে। এখানে জীবনের সংগ্রাম এবং সাধনা, আকাঙ্খাক্ষা এবং স্বপ্ন, আজ এবং আগামী কালের একটি বিন্দুতে এসে মিশে গিয়েছে।’

শিল্পি সুলতান ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারি। তাকে নড়াইলের মানুষ তথা বাংলাদেশের মানুষ শুধু চিত্রশিল্পী হিসেবে স্মরণ করবে না, বরং জীবনঘনিষ্ট, মৃত্তিকা সংলগ্ন এক স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবেও মনে রাখবে।

সুলতান ছিলেন শিশুদের অকৃত্রিম বন্ধু। নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে তার আবাসস্থলে গড়ে তোলা ‘শিশুস্বর্গ’ আর চিত্রা নদীতে ভাসমান বিশাল নৌকাটি ওই বন্ধুত্ত্বের দু’টি প্রতীক।

এসএম সুলতান ১৯৮০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীণ প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার গ্রহন করেন। তিনি ১৯৫১ সালে নিউইয়র্কে, ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে তদানিন্তন পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও ১৯৮১ সালে  ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে আন্তর্জাতিক জুরি কমিটির অন্যতম সদস্য মনোনীত হন। তাছাড়াও ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা পদক ও ১৯৮৫ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মানে ভূষিত হন। বাংলাদেশে দুটি রাষ্ট্রীয় পদক ও একটি চারুশিল্পী সংসদ সম্মানে ভূষিত হন যাহা নিম্নরূপ।

১. একুশে পদক – ১৯৮২ইং সনে
২. স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার – ১৯৯৪ইং সনে
৩. চারুশিল্পী সংসদ সম্মান – ১৯৮৫ইং সনে

নড়াইলের গর্ব বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান আধুনিকতার একটি নিজস্ব সংজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। তার তেমন কোন অনুসারি ছিল না যারা একই সংজ্ঞা মেনে শিল্পচর্চা করতেন। এ কারনেণেই তার প্রতিষ্ঠিত আধুনিকতার স্বরূপ নিয়ে নতুন কোন ধারার সৃষ্টি হয়নি। কেউ তার মতো করে আধুনিকতার ব্যাখ্যাও দেননি। এছাড়াও তার মতো মাটির জীবন তখনকার কোনো শিল্পী  যাপন করেননি। তার কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা কেমন ছিলো তা বলতে গিয়ে বাংলাপিডিয়ার তার জীবনী লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন “তাঁর কাছে অবয়ব ধর্মিতাই প্রধান। তিনি আধুনিক, বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি, তাঁর আধুনিকতা ছিলো জীবনের শাশ্বত বোধ ও শিকড়ের প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ফর্মের নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তির উত্থানকে, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এবং ঔপনিবেশিক সংগ্রামের নানা প্রকাশকে তিনি সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপন করেছেন। এটাই তাঁর কাছে ছিলো “আধুনিকতা” অর্থাৎ তিনি ইউরো কেন্দ্র্র্রীক, নগর নির্ভর যান্ত্রিকতা-আবদ্ধ আধুনিকতার পরিবর্তে অন্বেষণ করেছেন অনেকটা ইউরোপের রেনেসাঁর শিল্পীদের মতো মানবের কর্ম বিশ্বকে।”

মাটি,মানুষ ও প্রকৃতির শিল্পি এসএম সুলতান তার শেষ জীবনে বলে গিয়েছেন- “আমি সুখী। আমার কোন অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।” এসএম সুলতান ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসাপাতালে ৭১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন এই মুকুটহীন সম্রাট।

তথ্যসূত্র : বাংলা পিডিয়া, এস এম সুলতান স্মরকগ্রন্থ

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!