মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়
একবার খেলে স্বাদ ভুলা যায়না! মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়ের তুলনা হয়না! হাজারী গুড় শুধু একটি মিষ্টি পণ্য নয়, এটি মানিকগঞ্জের মানুষের জীবনধারা এবং সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গুড়ের ইতিহাস ২০০ বছরের বেশি। দুই শতাব্দি আগে একজন গাছির নাম থেকে গুড়ের নাম করণ হয় হাজারিগুড়।
প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের কৃষকরা আখ চাষ এবং গুড় উৎপাদন করে আসছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
.png)
ব্রিটিশ শাসনামলে এই গুড়ের সুনাম এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এখনো এই গুড়ের কদর রয়েছে দেশ বিদেশে। কথিত আছে ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথকেও মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় উপহার দেয়া হয়েছিল। রাণী এলিজাবেথ এই গুড়ের স্বাদ আস্বাদন করে প্রশংসা করেছিলেন।
শীত মৌসুম এলেই হাজারী গুড়ের কারণে মানিকগঞ্জ পরিণত হয়ে উঠে রীতিমত একটা শিল্পে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, দুই শ বছর আগে ঝিটকা এলাকার শিকদার পাড়ার মো. হাজারি নামের এক ব্যক্তি এই গুড়ের প্রবর্তক। তার নামানুসারেই এই গুড়ের নাম হয়েছে হাজারি গুড়।
প্রবীণদের মতে, গাছের রস থেকে বিশেষ কৌশলে সুগন্ধময় স্বাদ সফেদ এ গুড়ের উদ্ভাবন করেছিলেন হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন হাজারী। প্রকৃত হাজারী গুড় তৈরীর গোপন কৌশল একমাত্র তার পরিবারের সদস্যদের মাঝেই রয়ে গেছে। আজও এ গুড় নিয়ে মানিকগঞ্জবাসীর অহংকারের কমতি নেই। তার নামেই এই গুড়ের নামকরণ করা হয়েছে “হাজারী গুড়”।
প্রথম কাটার খেজুর রস দিয়ে তৈরি হয় হাজারি গুড়। আগের দিন বিকেলে খেজুর গাছের ছাল কেটে বেঁধে দেওয়া হয় হাঁড়ি। তারপর ভোর বেলায় সেই রস সংগ্রহ করে জ্বাল দিয়ে বিশেষ কায়দায় তৈরি হয় হাজারী গুড়।
হাজারী গুড় তৈরির প্রক্রিয়া একটি পরিশ্রমসাধ্য এবং দক্ষতাসাপেক্ষ কাজ, যা পরিবারগুলোকে একত্রিত করে এবং তাদের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করে। গুড় তৈরির সময় পুরো গ্রাম একটি উৎসবের রূপ নেয়, যেখানে সবার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা থাকে। এছাড়াও, হাজারী গুড় মানিকগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অপরিহার্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন, বিয়ে, পুজো বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে এই গুড়ের ব্যবহার অপরিহার্য।
যেভাবে তৈরি হয় হাজারী গুড় :
স্থানীয় গাছিরা দুপুরের পর থেকে খেজুর গাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে দেয়। সারা রাত ওই হাড়িতে রস পড়ার পর ভোর রাতে আবার গাছ থেকে হাঁড়ি নামানো হয়। এরপর গাছি পরিবারের মহিলারা মাটির চুলায় ভোর থেকে রস জাল দিয়ে ঘন করে। রসের ঘনত্ব বেড়ে গেলে একটি মাটির হাঁড়িতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘুটে ঘুটে তৈরি করা হয় সাদা রঙের হাজারী গুড়। বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ গুড় উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য সময়।
আগের দিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে (সূর্য উঠার আগে) গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির তৈরি জালা অথবা টিনের তৈরি তাফালে (পাত্র) বাইনে (চুলা) জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড় কুটো, নাড়া ও কাঁশবন। এ গুড় দেখতে যেমনি সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। মিষ্টি ও টলটলে রস ছাড়া এ গুড় হয় না।
মানিকগঞ্জের মানুষের কাছে হাজারী গুড় শুধু একটি পণ্য নয়, এটি তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং গর্বের প্রতীক, যা তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে চলেছেন।