স্যরি- কিন্তু এবং কেন?
"সরি (Sorry) এবং থ্যাংক ইউ (ঠবৃসত জ)" বহুল প্রচলিত দুটি শব্দ। স্যরি বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? একটা ‘Sorry’ বলেই সব দায় শেষ? ব্যাপারটা এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, কেউ কেউ ভাবছেন -একটা স্যরি বলেই বুঝি সব ঝামেলা থেকে বেঁচে গেলাম!
বর্তমানে ‘স্যরি’ শব্দটি শুধু ক্ষমা চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী এর অর্থ বদলে যায়। যেমন-কারো প্রিয়জন মারা গেলে আমরা বলি, ‘I am sorry for your loss’। এখানে নিজের কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে না, বরং শোকাহত ব্যক্তির প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা হচ্ছে।
আবার কারও কথা বুঝতে না পারলে ‘স্যরি’ বলে তার কথাটি পুনরায় জানতে চাওয়া হয়। কোনো কথা ভুল বললে সেটি সংশোধন করতেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এমনকি কোনো কিছুর অবস্থা খুব খারাপ বোঝাতেও ‘স্যরি’ ব্যবহৃত হয়।
কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে শব্দটির ব্যবহার শুধু অনুশোচনা থেকে সমবেদনা, ভদ্রতা এবং কথোপকথনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
শব্দটির ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তনটি ঘটে এর অর্থের বিবর্তনে। প্রথম দিকে ‘স্যরি’ বলতে নিজের দুঃখ বা কষ্টের অনুভূতি বোঝানো হলেও, সময়ের সঙ্গে এর অর্থের পরিধি বাড়তে থাকে। দ্বাদশ শতকের দিকে শব্দটি অনুশোচনা, অপরাধবোধ কিংবা নিজের কোনো কাজের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার অর্থেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
অর্থাৎ, কেউ ভুল করেছেন এবং সেই ভুলের জন্য তার মনে অনুশোচনা হচ্ছে-এমন পরিস্থিতি বোঝাতেও ‘স্যরি’ ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে শব্দটির অর্থ আরও বিস্তৃত হয়। নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্যের কষ্টে সমবেদনা প্রকাশ করতেও এটি ব্যবহৃত হতে থাকে।
তবে বর্তমানে আমরা যেভাবে শুধু ‘স্যরি’ বলে ক্ষমা চাই, সেই স্বতন্ত্র ব্যবহারটি অনেক পরের। অনলাইন ব্যুৎপত্তি অভিধান Etymonline-এর তথ্য অনুযায়ী, ‘আই অ্যাম সরি’ বাক্যাংশের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে শুধু ‘স্যরি’ বলে ক্ষমা চাওয়ার ব্যবহার ১৮৩৪ সালের দিকে দেখা যায়। অর্থাৎ, যে শব্দ একসময় নিজের মানসিক যন্ত্রণা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, সেটিই ধীরে ধীরে অন্যের কাছে নিজের ভুল স্বীকারের ভাষা হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কেউ কষ্ট পেলে তিনি চান, অন্যজন তার কষ্টটা বুঝুক। নিজের ভুলটা অন্তত স্বীকার করুক। কিন্তু কেবল মুখে দুঃখ প্রকাশ করলেই এই চাওয়া পূরণ হয় না।
মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমিস্টার এ বিষয়ে একটি ধারণা দিয়েছেন। তিনি একে বলেছেন ‘ম্যাগনিটিউড গ্যাপ’। সহজ করে বললে, যিনি কষ্ট দিয়েছেন, তিনি নিজের ভুল যেভাবে দেখেন, যিনি কষ্ট পেয়েছেন তার কাছে সেটি বেশি গুরুতর। এই দুই পক্ষের ভাবনার পার্থক্যের কারণে ক্ষমা চাইলেও অনেক সময় মন গলে না।
তাই ক্ষমা চাইতে হলে মানুষকে অনেক বেশি বিনয়ী হতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে মনে হতে পারে—মাথা নত করতে হচ্ছে। তবে এটি খুব জরুরি একটি বিষয়।
১৭৫টি গবেষণার মেটা-অ্যানালাইসিস থেকে দেখা গেছে, ক্ষমার ক্ষেত্রে সরি বলাটা বেশ প্রভাব রাখে। একইসঙ্গে নিজেদের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি, মানসিক চাপ কমার মতো বাড়তি পাওয়া তো রয়েছেই। মানবিক সম্পর্কও আরও জোরদার হয়।'
২০০৬ সালে মনোবিজ্ঞানী জুডি ইটন ও তার সহকর্মীরা পরীক্ষা করেন, অন্যের অনুভূতির স্বীকৃতি পেলে ক্ষমা করার আগ্রহ বাড়ে কি না। তারা একটি অনলাইন খেলার আয়োজন করেন। এতে প্রতিপক্ষ অন্যায্য আচরণ করে অংশগ্রহণকারীদের হারিয়ে দেন। এরপর প্রতিপক্ষ চার ধরনের বার্তার একটি দেন—শুধু ক্ষমা চাওয়া, অন্যায় স্বীকার করা, দুটিই করা অথবা কিছুই না বলা।
গবেষকেরা দেখেন, প্রতিপক্ষ কিছু না বললে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অনুভূতির স্বীকৃতি কম পেয়েছেন বলে মনে করেন এবং ক্ষমা করতেও কম আগ্রহী হন। শুধু ‘আমি দুঃখিত’ বললেও তেমন লাভ হয়নি। বরং অন্যায় আচরণ স্বীকার করলে তারা বেশি স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে মনে করেন এবং ক্ষমা করার আগ্রহও বেড়েছে।
স্যরি’ শব্দটি কোথা থেকে এলো?
কোনো ভুল করে ফেলেছেন পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি শব্দ, ‘স্যরি’।
কাউকে আঘাত করেছেন, ভুল করে কারো মন খারাপ করেছেন কিংবা সামান্য কোনো ভুল করে ফেলেছেন পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি শব্দ, ‘স্যরি’। কখনো সম্পর্ক বাঁচাতে, কখনো নিজের অপরাধবোধ প্রকাশ করতে, আবার কখনো নিছক ভদ্রতা দেখাতেও আমরা শব্দটি ব্যবহার করি।
ছোট্ট এই শব্দটির ব্যবহার এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, দিনে কতবার এটি বলছি, তার হিসাবও রাখি না। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ‘স্যরি’ শব্দটির জন্ম কোথায়? কীভাবে একটি শব্দ দুঃখ, অনুশোচনা এবং ক্ষমা চাওয়ার ভাষা হয়ে উঠল? এর পেছনে রয়েছে কয়েকশ বছরের ভাষার ইতিহাস।
‘স্যরি’ শব্দের জন্ম কোথায়?
ইংরেজি ‘স্যরি’ শব্দটির শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রাচীন ইংরেজি বা ওল্ড ইংলিশের যুগে। ভাষাবিদদের মতে, শব্দটির আদি রূপ ছিল ‘Sārig’। প্রাচীন ইংরেজিতে এর অর্থ ছিল ব্যথিত, দুঃখিত, মানসিকভাবে কষ্ট পাওয়া কিংবা গভীর শোকের মধ্যে থাকা।
অর্থাৎ, শুরুতে ‘স্যরি’ শব্দটি সরাসরি কাউকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো না। বরং নিজের মনের কষ্ট, দুঃখ কিংবা বেদনা বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহৃত হতো। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, ‘Sārig’ শব্দটির উৎস পশ্চিম জার্মানিক ভাষাগোষ্ঠীর একটি শব্দমূল, যার সঙ্গে ইংরেজি ‘Sore’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। ‘Sore’ বলতে বোঝায় ব্যথা, যন্ত্রণা কিংবা ক্ষত। সেই অর্থের সূত্র ধরেই ‘স্যরি’ শব্দের প্রাথমিক অর্থ দাঁড়ায় যন্ত্রণাকাতর বা দুঃখে ভারাক্রান্ত।
এখানে মজার বিষয় হলো, ‘স্যরি’ শব্দটির বানান ও উচ্চারণের পরিবর্তনে ‘সরো’ শব্দটিরও প্রভাব রয়েছে। যদিও ‘স্যরি’ এবং ‘সরো’ দেখতে কাছাকাছি হলেও শব্দ দুটির প্রকৃত ব্যুৎপত্তিগত উৎস এক নয়।
‘স্যরি’ বললেই কি ক্ষমা চাওয়া হয়ে যায়?
শব্দটির ইতিহাস জানার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। শুধু মুখে ‘স্যরি’ বললেই কি কারও কাছে ক্ষমা চাওয়া সম্পূর্ণ হয়?আসলে ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে শব্দটির চেয়ে এর পেছনের আন্তরিকতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ ভুল করার পর শুধু পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘স্যরি’ বললে সেটি অনেক সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে নিজের ভুল স্বীকার করে তার দায় নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ভুল না করার চেষ্টা একটি আন্তরিক ক্ষমা চাওয়ার অংশ।
এ কারণেই ইংরেজিতে ‘আই অ্যাম স্যরি’ বলার পাশাপাশি ‘আই অ্যাপোলজি’ কিংবা ‘প্লিজ ফরগিভ মি’ বলার প্রচলনও রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব বাক্যাংশের ব্যবহার আলাদা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ‘স্যরি’ শব্দটির ইতিহাস আমাদের দেখায়, ভাষা কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। যে শব্দের শুরু হয়েছিল ব্যথা ও মানসিক কষ্টের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে, সেটিই আজ মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন সামলানোর অন্যতম পরিচিত শব্দ।
মাত্র পাঁচটি অক্ষরের এই শব্দটি তাই শুধু একটি ক্ষমা চাওয়ার বাক্য নয়, বরং মানুষের অনুশোচনা, সহমর্মিতা এবং সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ববোধ প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
ন্যাশনাল স্যরি ডে
প্রতি বছর ২৬ মে অস্ট্রেলিয়ায় পালিত হয় ‘ন্যাশনাল স্যরি ডে’ (National Sorry Day)। দেশটির আদিবাসী শিশুদের পরিবার থেকে জোর করে বিচ্ছিন্ন করার বেদনাদায়ক ইতিহাস স্মরণে দিনটি পালন করা হয়।
এসব শিশু ও তাদের প্রজন্ম ‘স্টোলেন জেনারেশনস’ (Stolen Generations) নামে পরিচিত। একই সঙ্গে অতীতের অন্যায়ের স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের প্রতি সংহতি জানানোর দিন এটি।
ইতিহাসের এই স্মরণদিবসের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও ক্ষমা চাওয়ার গুরুত্ব অনেক। তবে মুখে শুধু ‘স্যরি’ বা ‘দুঃখিত’ বললেই যে সব সময় ক্ষমা পাওয়া যায়, বিষয়টি এমন নয়। কিছু পরিস্থিতিতে একটি ‘স্যরি’ যথেষ্ট হয় না। বরং আন্তরিকতা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে ক্ষমা চাইলে তা অন্যের মনে আলাদা জায়গা করে নিতে পারে।
ক্ষমা চাওয়ার উপায়
ভুল মানুষেরই হয়। কখনো অজান্তে, আবার কখনো রাগের মাথায়। কখনো নিজের অজান্তেই প্রিয় কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেলি আমরা। ভুল বোঝাবুঝির কারণেও তৈরি হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। তাই ক্ষমা চাইতে আমরা সাধারণত একে অপরকে ‘স্যরি’ (Sorry) বলে থাকি।
মুখে শুধু ‘স্যরি’ বলার বাইরে চেষ্টা করতে পারেন এই ১০টি উপায়
১. হাতে লেখা চিঠি: মেসেজের বদলে নিজের হাতে ছোট্ট একটি চিঠি লিখুন। কোথায় ভুল করেছেন এবং কেন অনুতপ্ত, তা নিজের ভাষায় জানান।
২. প্রিয় খাবার দিয়ে চমক: তার পছন্দের খাবার রান্না করুন বা অর্ডার করুন। সঙ্গে ছোট্ট একটি নোট দিতে পারেন: ‘জানি, এতে সব ঠিক হবে না, তবু তোমার মুখে হাসি দেখতে চাই।’
৩. স্মৃতির অ্যালবাম: একসঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর ছবি দিয়ে ছোট অ্যালবাম বানান। শেষ পাতায় লিখুন, ‘এই সম্পর্কটা আমার কাছে এখনো অনেক মূল্যবান।’
৪. পছন্দের গানের প্লেলিস্ট: তার পছন্দের গান দিয়ে একটি প্লেলিস্ট তৈরি করুন। নাম দিতে পারেন–‘তোমার মন ভালো করার চেষ্টা’।
৫. ছোট্ট ভিডিও বার্তা: নিজের ভুল স্বীকার করে আন্তরিকভাবে একটি ভিডিও রেকর্ড করুন। সাজানো সংলাপ নয়, বলুন মনের কথা।
৬. একদিনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে: তার নিয়মিত কাজের কিছু দায়িত্ব নিয়ে নিন। কথার চেয়ে কাজে অনুশোচনা প্রকাশ করুন।
৭. প্রিয় জায়গায় নিয়ে যাওয়া: দুজনের বিশেষ কোনো স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় যাওয়ার প্রস্তাব দিন। সেখানে পুরোনো সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে করতে পারেন।
৮. ছোট্ট উপহার: দামি কিছু নয়, তার পছন্দের বই, ফুল কিংবা ছোট কোনো স্মারক উপহার দিন।
৯. মন দিয়ে শোনা: কোনো অজুহাত না দিয়ে তাকে নিজের কষ্টের কথা বলতে দিন। মাঝখানে বাধা না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
১০. পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি: শুধু ক্ষমা চেয়ে থেমে যাবেন না। যে আচরণে কষ্ট দিয়েছেন, তা বদলানোর বাস্তব উদ্যোগ নিন।
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে, অক্সফোর্ড ডিকশোনারি হিস্টোরি, ওয়ার্ল্ড ইংরেজি হিস্টোরিক্যাল ডিকশোনারি