ঢাকা,  শনিবার   ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

[ ফিচার ]

মুসলমানদের হাত ধরেই রচিত হয় কফি আবিষ্কারের গল্প

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১০:৫৪, ৭ নভেম্বর ২০২৬
মুসলমানদের হাত ধরেই রচিত হয় কফি আবিষ্কারের গল্প
বণিক, পর্যটক ও হজযাত্রীদের হাত ধরে কফি দ্রুতই মক্কা-মদিনায় ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতাব্দীতে কায়রো হয়ে তা পৌঁছায় অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে, যেখানে গড়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম দিককার কফি হাউসগুলো..

জ্বালানী তেলের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিক্রিত পণ্য এবং বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বেশি পানকৃত পানীয়র মধ্যে অন্যতম নাম কফি।   এক কাপ গরম কফি দিয়ে প্রতিদিনের যাত্রা শুরু করেন বিশ্বের  লক্ষ কোটি মানুষ। এই কফি বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রচলিত উত্তেজক পানীয় হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন- সুফি সাধকেরা দীর্ঘ সময় ইবাদত ও ধ্যানের সময় জেগে থাকার জন্য কফি পান করতেন।

ইতিহাসবিদ আবদুল কাদির আল-জাজিরির বর্ণনায় জানা যায়, প্রতি সোমবার ও শুক্রবার রাতে বড় মাটির পাত্রে কফি প্রস্তুত করা হতো এবং ধর্মীয় আচার পালনের সময় তা সবার মধ্যে বিতরণ করা হতো।

কফি চেরি নামক এক ধরনের ফলের বীজ যা "কফি বীজ" নামে পরিচিত তা পুড়িয়ে গুঁড়ো মিশিয়ে কফি তৈরি হয়। কফিতে ক্যাফেইন নামক এক প্রকার উত্তেজক পদার্থ রয়েছে। ৮ আউন্স কফিতে প্রায় ১৩৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। কফির উপাদান ক্যাফেইনের জন্যে কফি মানুষের উপর উত্তেজক প্রভাব ফেলে ও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। চায়ের পরই কফি বিশ্বের অত্যধিক জনপিয় পানীয়।

কফি আবিষ্কার নিয়ে মজার কাহিনী প্রচলিত আছে -

কফি আবিষ্কারের নেপথ্যে যে মুসলিম অজপাল

কাহিনী-এক.
ইথিওপিয়াতে কালদি নামক একজন আরবীয় মুসলিম রাখাল বসবাস করতেন। আনুমানিক ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা। মেষ চরাতে গিয়ে তিনি একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করলেন। আর তা হলো-তিনি যখন সারা দিন মেষ চরিয়ে প্রচলিত রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন তার মেষগুলোর আচরণ স্বাভাবিকই থাকে। কিন্তু যখন তিনি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন মেষগুলো অস্থির আচরণ শুরু করে, এমনকি বাড়ি ফিরেও এরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে ও উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করে। 

এ বিষয়টি লক্ষ করে কালদির মনে বিশেষ কৌতূহলের জন্ম হলো। তিনি এ বিষয়টির কারণ খুঁজে বের করার জন্য মেষগুলোর গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। একদিন তিনি খেয়াল করলেন, জঙ্গল দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মেষগুলো একটি নির্দিষ্ট ঝোপের উজ্জ্বল লাল রঙের জাম জাতীয় ফল (Berry) খাচ্ছে, আর ফলগুলো খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এরা আকস্মিকভাবে অনেক বেশি সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়ে লাফ-ঝাঁপ দিচ্ছে এবং চঞ্চল হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। এ বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে কালদি নিজে ওই ফলটি বীজসহ খেলেন। 

আশ্চর্যের বিষয়! ফলটি খেতে ভীষণ তেতো হলেও এটি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কালদির সারা দিনের ক্লান্তি যেন মুহূর্তে দূর হয়ে গেল। তিনি এক অসাধারণ সজীবতা ও উৎফুল্লতা অনুভব করতে লাগলেন। কয়েক দিনের মধ্যে ফলটির এ আশ্চর্য গুণের কথা স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে তারাও ওই ফলটি খাওয়া শুরু করল। কিন্তু ফলটির স্বাদ তেতো হওয়ায় তারা গরম পানিতে ফলটি ফুটিয়ে ওই পানি পান করত। ইথিওপিয়ায় আবিষ্কৃত সেই আর্শ্চযজনক ফলটিই ছিল আজকের ‘কফি ফল’।

International Coffee Day: ইথিওপিয়া থেকে কুর্গ—আপনার এক কাপ কফির পেছনে  লুকিয়ে আছে কোন অজানা ইতিহাস?

কাহিনী-দুই.
মরক্কোর অধিবাসী ‘সাজিলিয়া’ সুফি তরিকার প্রবর্তক হজরত শেখ আল সাজিলি (রহ.) [১১৯৬-১২৫৮ খ্রি.] সাধনা জীবনের শুরুতে মরক্কোর একটি পাহাড়ে ইবাদত-বন্দেগিতে নিমগ্ন থাকতেন। সে সময় একাধারে ৪০ দিন তিনি দিনের বেলায় রোজা রাখতেন এবং রাতের বেলায় জিকির-আজকার ও মুরাকাবা (আল্লাহপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে ধ্যান সাধনা) করতেন। এভাবে সারা দিন রোজা রাখা এবং রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার কারণে তিনি প্রায়ই খুব ক্লান্তি অনুভব করতেন। 

এমতাবস্থায় তিনি তার ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করার উপায় খুঁজতে থাকেন। একদিন তিনি লক্ষ করলেন, পাহাড়ের আশপাশে যে পাখি রয়েছে, তারা সারা দিন খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায় এবং রাতের বেলায়ও তারা ঘুমায় না, বরং কিচিরমিচির শব্দে চারদিক মাতিয়ে রাখে। সারা রাত না ঘুমিয়েও পাখিগুলো সারা দিন সজীব ও সতেজ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। বিষয়টি তাকে অত্যন্ত অবাক করে তুলল। অনেক ভেবেও তিনি এ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলেন না। এর কিছুদিন পর তিনি খেয়াল করলেন, সেই পাখিগুলো জামজাতীয় এক ধরনের ফল গাছে বসে আছে। এরা ওই গাছ থেকে ফল খাচ্ছে এবং খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এরা অনেক সজীব ও সতেজ হয়ে যাচ্ছে। 

এ দৃশ্য দেখার পর সাজিলি (রহ.) ওই গাছ থেকে ফল পেড়ে তা মুখে দিলেন, কিন্তু তিক্ততার কারণে ফলটি তিনি খেতে পারলেন না। তাই তিনি ফলটি আগুনে পুড়িয়ে পোড়া ফল পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানি পান করলেন। পানীয়টি পান করার সঙ্গে সঙ্গে তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও চাঙা হয়ে উঠলেন। এরপর থেকে তিনি রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য নিয়মিত পানীয়টি পান করতে থাকেন। সাজিলি (রহ.) যে ফল থেকে পানীয়টি প্রস্তুত করেছিলেন, সেটিই ছিল ‘কফি ফল’। 

পরে সাজিলি (রহ.)-এর অনুসরণে তার ভক্ত-মুরিদ এবং মরক্কোর অন্যান্য সুফি-সাধকরাও রাত্রিকালীন ইবাদতে জেগে থাকতে এবং মনোযোগ ধরে রাখার জন্য কফি পান করা শুরু করেন। আর এভাবেই সুফি-সাধকদের হাত ধরে কফি পানের অভ্যাস স্থানীয় অধিবাসীসহ সমগ্র মরক্কোব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

অটোমান কফিহাউস - উইকিপিডিয়া

অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে
কফির বিশ্বজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি আসে অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরে। ষোড়শ শতাব্দীতে তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল) কফি পৌঁছানোর পর এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ইস্তাম্বুলে একটি পাবলিক কফি হাউজ খোলা হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অনেক কফি হাউজ গড়ে ওঠে। মক্কা ও কায়রোর মতো এ কফি হাউজগুলোও অটোমান সাম্রাজ্যের সব শ্রেণির মানুষের জমজমাট আড্ডা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চা, সংবাদ সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।

কফিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ইয়েমেনের সুফি সাধকদের। পঞ্চদশ শতাব্দীতে তাঁরা রাতভর ইবাদত ও জিকিরে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নিয়মিত কফি পান করতেন। এভাবেই সুফিদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কফির প্রচলন শুরু হয়।

বণিক, পর্যটক ও হজযাত্রীদের হাত ধরে কফি দ্রুতই মক্কা-মদিনায় ছড়িয়ে পড়ে। ষোড়শ শতাব্দীতে কায়রো হয়ে তা পৌঁছায় অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে, যেখানে গড়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম দিককার কফি হাউসগুলো — যা পরিণত হয় আড্ডা আর জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে।

কফি হাউজের আড্ডা-বিপ্লবীদের সামাজিক যোগাযোগ
মান্না দের “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা” গানটির পেছনে লুকিয়ে আছে এক ঐতিহাসিক সত্য। ছাত্র-শিক্ষক, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মানুষদের জন্য কফি হাউজগুলো ছিলো ইন্টারনেটের মতো। ডাচদের সাথে ঠাণ্ডা যুদ্ধ, ধূমকেতুর আগমন কিংবা প্লেগের আশঙ্কা; এ ধরনের খবরগুলো কফি হাউজ ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না।

বিপ্লবীদের সংগঠিত হবার জায়গা হিসেবে এই কফি হাউজগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিলো। নিত্যদিনের বিনোদনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলো কফি হাউজগুলো। নাচ-গান, দাবা খেলা, রাজনীতি কিংবা অন্য কোনো আলোচিত বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, গল্পগুজব সবই চলতো সেখানে। তখন এই কফি হাউজগুলোর ডাক নাম ছিলো “স্কুল অফ দ্য ওয়াইজ”, তথা “বিজ্ঞদের পাঠশালা”।

১৬৭৫ সাল নাগাদ কেবল ইংল্যান্ডেই তিন হাজারের ওপর কফি হাউজ নির্মিত হয়। কোনো কোনোটাতে এমনকি রাতে থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা ছিলো। অনেকেই তুর্কি কফি হাউজগুলোর ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করা শুরু করেছিল। তাদের নামগুলোও ছিল দারুণ গালভরা- ডিকেন’স ফেম, ব্ল্যাকমোর’স হেড, ওরিয়েন্টাল সিগার ডিভাইন, জেরুজালেম কফি হাউজ, মোরাত দ্য গ্রেট, সুলতানিজ কফি হাউজ ইত্যাদি।

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানাযায়-  ষোড়শ শতকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কফি পানের প্রচলন শুরু হয়। এর পর কফি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।

এবার জানাব কফি সম্পর্কে কিছু তথ্য। কফির আদি নিবাস ইথিওপিয়ায়। তবে আরবে ১৪ শতকের দিকে কফির চাষ করা হতো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৫ শতকের দিকে আরবরা সর্বপ্রথম কফি উৎপাদন করেন। ১৮৪৩ সালে এক ফ্রান্স নাগরিক সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে কফি তৈরির মেশিন আবিষ্কার করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাৎসরিকভাবে ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় কফি দিবস পালন করা হয়। 

Roar বাংলা - শয়তানের পানীয় খ্যাত কফির ৮টি মজার ইতিহাস

কফি নিয়ে বিরোধ-বিতর্ক
১৪৭৫ সালে তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলে পৃথিবীর প্রথম কফি হাউজ চালু করা হয়। মুসলমানদের আবিষ্কার হলেও অনেক মুসলমান রাষ্ট্রে কফিকে বাঁকাচোখে দেখা হতো। ১৫১১ সালে মক্কার পণ্ডিতেরা কফি খাওয়া নিষিদ্ধ করেন। তৎকালীন মক্কার গভর্নর খায়ের বেগ মনে করতেন, কফির আড্ডায় জনগণের চাপা রোষ জেগে উঠবে। ফলে তার সরকারের পতন ঘটবে। জোর করে কফিকে হারাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কফি আসলেই বিষাক্ত কি না, তা নিয়ে মতভেদ ছিলো। প্রায় তেরো বছর এ নিয়ে ঝামেলা লেগে থাকে।

অবশেষে, ১৫২৪ সালে ওসমানীয় সুলতান প্রথম সেলিম ফতোয়া জারি করে কফি খাওয়া আবার চালু করেন। খায়ের বেগকে অবৈধ কার্যকলাপের জন্য ফাঁসি দেওয়া হয়। এরপরে ১৫৩২ সালে কায়রোতে কফি খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। তখন সেখানকার সব কফিহাউজ ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল।

ষোড়শ শতকের মধ্যেই সিরিয়া, তুরস্ক, পারস্য, মিশরের মতো দেশগুলোতে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো কফি। ভিনদেশীরা একে বলতো ‘আরবের ওয়াইন’। যখন পবিত্র নগরী মক্কায় হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর লাখো মুসলিমের সমাবেশ হতো, তখন ইথিওপিয়া থেকে কফির বীজ এনে বণিকেরা রমরমা ব্যবসা করেন মুসলমানদের কাছে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের রাত জেগে সাধনা করার পেছনে কফি দারুণ ভূমিকা রাখতো।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে খুব দ্রুতই এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে বলকান, ইতালী থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে। পশ্চিমে আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকায় কফির প্রচলন ঘটায় ডাচেরা। ১৭২০ সালে লাতিন আমেরিকায় কফির আবাদ শুরু হয়।ইন্দোনেশিয়া ছাড়িয়ে প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও দ্রুতই সবার নজর কাড়ে কফি। 

কফির ইতিহাস - উইকিপিডিয়া

শয়তানের পানীয় বলে নিষিদ্ধ করা হয় কফিকে
সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ইতালির ব্যবসায়ীরা প্রথম বাণিজ্যিকভাবে কফিকে ইউরোপের মাটিতে নিয়ে আসেন। ইউরোপের মানুষ কফি পান করার পর তাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ কেউ এর অসাধারণ উদ্দীপক গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়, আবার কেউ ভাবতে থাকে, ‘এ আবার কেমন পানীয়, যা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়!’ এরই ধারাবাহিকতায় ইতালির ভেনিসের কয়েকজন লোক কফিকে ‘শয়তানের পানীয়’ হিসাবে আখ্যা দিয়ে তা নিষিদ্ধ করার দাবি জানালেও খুব দ্রুতই কফি ইউরোপজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

জানাগেছে-বিশ্বের প্রায় ৭০টি  দেশে কফি ফলের গাছ জন্মে। সবুজ কফি বিশ্বের সব থেকে বেশি বিক্রীত কৃষিপণ্যের মধ্যে একটি। আমেরিকার নাগরিকগণ প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন কাপ কফি পান করে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ২৩%-৬৭% ঝুঁকি কমার তথ্য পাওয়া গেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন তিন কাপ করে কফি পান হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। এ ক্যাফেইন রক্তের এলডিএল (ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল) কমাতে এবং এইচডিএল (উপকারী কোলেস্টেরল) বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখে। 

যারা এসবের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের প্রতিদিন চার কাপ কালো কফি পান খুবই উপকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চমকিত খবরটি হলো কফি পানে সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কমপক্ষে ৫ শতাংশ কমতে পারে। যারা দিনে ২-৩ কাপ কফি পান করেন তাদের ১০ শতাংশ এবং যারা ৪-৫ কাপ কফি পান করেন তাদের ১৪ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমে।

গবেষণা বলছে, আত্মহত্যা প্রবণতা কমায় কফি-
কমপক্ষে দুই লাখ মানুষের ওপর গবেষণার পর হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকরা জানিয়েছেন, নিময় করে প্রতিদিন কফি পান করলে মানুষের ভেতরের জঘন্য এ প্রবণতা অনেকাংশেই হ্রাস পায়। গবেষকদের মতে, কফির মধ্যে থাকা ক্যাফিন নামক রাসায়নিক যৌগটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে হলেও চনমনে করে তোলে। যার মাধ্যমে মানুষের হতাশা দূর হয়ে যায়। মানুষ বেঁচে থাকার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস পায়। 

ডিউক-এনইউএস গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল স্কুল সিঙ্গাপুর ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা পরিচালনা করে গবেষকরা বলেছেন, প্রতিদিন ২ কাপ বা তার বেশি কফি পান লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে অবধারিত মৃত্যুর ঝুঁকি ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত  হ্রাস করে।  ‘হেপাটোলজি’ সাময়িকীতে গবেষণা প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে। 

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো যে সব কফিশপ | The Business Standard

এবার পরিচিত হওয়া যাক কফির জন্য বিখ্যাত পৃথিবীর আটটি শহরের সাথে। 

লন্ডন - 
এসপ্রেসোকে ভিন্ন মাত্রায় এনে অসিস এবং কিউস শহরে ফ্ল্যাট হোয়াইট এবং ক্যাপাচিনোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। 

মেলবোর্ন- 
কফি যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মেলবোর্নবাসীর।  মেলবোর্ন শহরে আপনার ভালো লাগবে না এমন কফি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। 

আয়্যার ল্যান্ড- 
স্ক্যান্ডানেভিয়ানদের মাথাপিছু কফি গ্রহণের হার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। 

রোম- 
ইতালিয়ান সংস্কৃতির একটি অংশ কফি। হাতে গুণে কয়েকজনকে পাওয়া যাবে যারা কফি খান না। 

সিঙ্গাপুর - 
সিঙ্গাপুরের জীবনযাত্রায় সবসময়ই অংশ হয়ে আছে কফি। 

সিয়াটল- 
আমেরিকার ছোট অংশ সিয়াটলের ক্যাপিটল হিলে ভিকট্রোলা কফি রোস্টারস, কলাম্বিয়া সিটিতে ইম্পায়ার স্প্রেসো এবং সিটেল কফি ওয়ার্কসে আপনি খুঁজে পাওয়া যাবে পছন্দের স্প্রেসো এবং ক্যাপাচিনো। 

ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া-
ভিয়েনার ঐতিহ্য হিসেবে ২০১১ সালে ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত হয় কফি। 

ওয়েলিংটন, নিউজিল্যান্ড- 
ওয়েলিংটনে বাড়িতে, অফিস-আদালতেও আপ্যায়ন করার জনপ্রিয় উপকরণ কফি। 

কফি নিয়ে গবেষণার যেন অন্ত নেই-
গবেষণায় দেখা যায়, চার কাপ বা তার বেশী কফি পান তেমন ক্ষতিকর নয়। তবে আপনার যদি এতো বেশী কফি পানের অভ্যাস না থাকে তবে হুট করে চার কাপ কফি পান শুরু করে দেবেন না, তাতে হিতে বিপরীতও হতে পারে। তবে যারা নিয়মিত কফি পান করতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য সুখবর, কফি পানের অভ্যাস  কয়েক ধরণের স্কিন ক্যান্সার থেকে নিরাপত্তা। 

তবে আগে জানা দরকার দিনে কত কাপ কফি নিরাপদ? গবেষকেরা বলছেন, দিনে চার কাপের বেশি কফি পান না করাই ভালো। বিজ্ঞানীরা বলছেন,  দৈনিক দুই থেকে তিন কাপ কফি পান আসলে খারাপ নয়। 

জেনে রাখা ভাল সব জিনিসেরই ভাল-মন্দ দুটি দিক থাকে। যুক্তরাজ্যের দি গ্লেন হাসপাতাল ব্রিসটলের কনসালটেন্ট সার্জন এবং ওজন কামানোর বিশেষজ্ঞ স্যালি নরটন, ক্যাফেইন গ্রহণের সুবিধা অসুবিধার সম্পর্কে বলেছেন- গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যারা দিনে তিন কাপের বেশি কফি পান করেন তাদের শান্তির ঘুম খুব কমই হয়। 

আরেক গবেষণায়  দেখা গেছে, যারা কফি খান না তাদের থেকে কফি পানকারীদের ৭৯ মিনিট কম ঘুম হয়। তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে কফিকে না বলুন। দৈনিক পাঁচ কাপের বেশি কফি খেলে গর্ভধারণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। 

যদি মা হতে চান, তবে অবশ্যই কফি খাওয়ার পরিমাণ কমাতে হবে। দৈনিক ২০০ মি.গ্রাম ক্যাফেইন শরীরে গেলে গর্ভের শিশুর ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি জন্মক্রটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আশার খবরও আছে, ক্যাফেইন যুক্ত বা বিহীন, যেকোনো ধরনের কফি টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগের ও কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায় ঝুঁকি কমায়। লিভার বা যকৃতের মেদ কমাতে ক্যাফেইন কার্যকর ভূমিকা পালন করে। 

শরীর চাঙ্গা করতে ও ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রাখতে কফি পানের জন্য কিছুটা ভিন্ন সময়সূচির কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। কফি পানে অনেকটাই সতর্ক থাকা ভালো। কারণ এতে রয়েছে ক্রিয়াশীল মাদক ক্যাফেইন। 

তাই অতিরিক্ত কফি পান, আপনার সাময়িক মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটাতে পারে। ক্যাফেইন আসক্তি থেকে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা, নার্ভাসনেস, উত্তেজনা, রাগ, পরিপাকজনিত অবসাদ, পেশিতে টান পড়া, অকারণে কথা বলা, ঘুম না হওয়া, দ্রুত ও অনিয়মিত হার্টবিট ইত্যাদি। তাই কফি পান করার পর যদি এগুলোর মতো উপসর্গ টের পান, তবে এটা কফি ইনটক্সিকেশন হতে পারে। 

সাধারণত ক্যাফেইন মানুষকে উদ্যমী হতে সাহায্য করে, কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় ও ঘুমভাব কাটাতে সাহায্য করে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কফি পান করতে হবে। দিনে দু'বারের বেশি কফি পান না করাই ভালো। 

সূত্র : দি হেলথ সায়েন্স, বার্তা সংস্থা এএনআই, ‘হেপাটোলজি’ সাময়িকী অবলম্বনে- এস এম মুকুল, সমাজ বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক


 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!