ঢাকা,  রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

মাদকমুক্ত জীবন আপন ইচ্ছাতেও সম্ভব

ডা. রাইসুল ইসলাম পরাগ
প্রকাশিত: ১৩:০৩, ১ নভেম্বর ২০২৬
মাদকমুক্ত জীবন আপন ইচ্ছাতেও সম্ভব
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সেই বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সাহায্যটুকুও গ্রহণ করুন।

“মাদক ছাড়তে আমার ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। কন্ট্রোল আমার নিজের কাছেই।”

কথাটি অনেকেই বিশ্বাস করে বলেন। মাদক ছাড়ার ইচ্ছাটিও আন্তরিক হতে পারে। কিন্তু ছাড়তে চাওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারা, দুটি আলাদা বিষয়।

তাই শুধু “চাইলেই পারব” ভাবার পাশাপাশি গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতার দিকেও তাকানো প্রয়োজন।

বারবার সিদ্ধান্ত নিয়েও কি আবার নিচ্ছেন?
যতটুকু নেবেন ভেবেছিলেন, তার চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে?
পরিবার, কাজ বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও থামাতে পারছেন না?
মাদক না নিলে অস্থিরতা হচ্ছে, আর সেই অস্থিরতা কমাতে আবার নিচ্ছেন?

এমন হলে নিজের নিয়ন্ত্রণ কতটা আছে, সেটি নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।

কেন এমন হয়?
দীর্ঘদিন মাদক নিলে মস্তিষ্ক সেটির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মাদক পাওয়ার টান বাড়ে, আর সেই টান সামলানো কঠিন হতে পারে। ফলে শান্ত অবস্থায় আপনি যে সিদ্ধান্ত নেন, অস্থিরতা বা তীব্র টানের সময় সেটি ধরে রাখতে পারেন না।

সকালে আন্তরিকভাবে ভাবেন, “আর নেব না।” বিকেলে টান উঠলে মনই যুক্তি দিতে শুরু করে, “আজ একটু নিলে সমস্যা হবে না।”
তাই বারবার ফিরে যাওয়া মানেই আপনার ছাড়ার ইচ্ছাটি মিথ্যা ছিল, এমন নয়। হতে পারে, আপনার আরও চিকিৎসা, তত্ত্বাবধান ও নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন।

এখানেই কখনও ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কখন ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে?

১। মাদক ছাড়লে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকলে
বিশেষ করে নিয়মিত অ্যালকোহল বা কিছু ঘুমের ওষুধ গ্রহণের পর হঠাৎ বন্ধ করলে খিঁচুনি ও তীব্র বিভ্রান্তি হতে পারে। এমন ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন।

২। গুরুতর মানসিক বা শারীরিক সমস্যা থাকলে
আত্মহানির ঝুঁকি, বাস্তবতা বুঝতে সমস্যা, তীব্র উত্তেজনা কিংবা গুরুতর শারীরিক অসুস্থতায় হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

৩। বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়েও বারবার মাদকে ফিরে গেলে
নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার পরও ব্যবহার থামানো সম্ভব না হলে আরও নিবিড় সহায়তা দরকার হতে পারে। মূল্যায়নের পর চিকিৎসক ভর্তি থাকার পরামর্শ দিতে পারেন।

৪। বাড়ির পরিবেশে চিকিৎসা চালানো কঠিন হলে
সহজেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে, ব্যবহারের চাপ আছে অথবা পাশে সহায়তা করার মতো মানুষ নেই, এমন পরিস্থিতিতে আবাসিক চিকিৎসা সহায়ক হতে পারে।

উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থাকলে মাদক থেকে দূরে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। পাশাপাশি টান উঠলে কী করবেন, কোন পরিস্থিতিতে আবার নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং বাড়ি ফিরে কীভাবে সুস্থ থাকবেন, তা শেখানো হয়।

তবে মাদক ছাড়ার সময়ের গুরুতর শারীরিক সমস্যা সামলানোর হাসপাতাল এবং দীর্ঘমেয়াদি রিহ্যাবের কাজ এক নয়। আপনার কী প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের মূল্যায়নে ঠিক করতে হবে।

সবার ভর্তি প্রয়োজন হয় না। আবার ভর্তি থেকে বাড়ি ফিরলেই চিকিৎসা শেষ হয়ে যায় না। এরপরও নিয়মিত ফলোআপ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, কাউন্সেলিং ও পরিবারের সহযোগিতা দরকার হতে পারে।

যদি প্রতিবার “নিজেই পারব” বলার পর একই জায়গায় ফিরে আসেন, তাহলে এবার নিজের চেষ্টার সঙ্গে চিকিৎসার সহায়তাও যোগ করার সময় হয়েছে।

ভর্তি হতে ভয় লাগলে চিকিৎসককে বলুন। কেন ভর্তি প্রয়োজন, কী চিকিৎসা হবে, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নিয়ম কী এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা কেমন, জেনে নিন। সম্মানজনক ও নিরাপদ চিকিৎসা পাওয়া আপনার অধিকার।

নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সেই বিশ্বাসকে কাজে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সাহায্যটুকুও গ্রহণ করুন।

আজ সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই আপনার সুস্থ হয়ে ওঠার নতুন শুরু হতে পারে।

লেখক : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। রেজিস্ট্রার, মানসিক রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!