ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

সুদানের রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ খাচ্ছে কুকুর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:১৪, ১২ জুন ২০২৩
সুদানের রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ খাচ্ছে কুকুর
ছবি: সংগৃহীত

সুদানের রাজধানী খার্তুমের নিয়ন্ত্রণের জন্য সাত সপ্তাহের তিক্ত সংঘাতের পর এক নতুন সমস্যার সম্মুখীন সেখানকার বাসিন্দারা। আগে কখনো এমন সমস্যার মুখোমুখি হবেন বলে কল্পনাও করেননি। সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের পর রাজধানীটির রাস্তাঘাটে চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মরদেহ।

ওমর (ছদ্মনাম) নামে এক বাসিন্দা পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি মৃত তিনজনকে তাদের ঘরের ভেতরে দাফন করেছি। আর বাকিদের শুধু রাস্তার মাথার পাশেই দাফন করেছি।

তিনি আরো বলেন, আমি ঘরের দরজা খুলেই দেখি কুকুর মানুষের মরদেহ চিবিয়ে খাচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখার চেয়ে এভাবে দাফন করাও শ্রেয়। আমি অন্তত ২০ জনকে দাফন করেছি। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত কতজন মারা গেছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে হাজারের বেশি বেসাময়িক মানুষ এ যুদ্ধে নিহত হয়েছে।

Advertisement

ওমর সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘আমার এক প্রতিবেশীকে তার বাড়িতে মারা হয়েছে। আমি কিছু করতে পারিনি। পরে তার ঘরের মেঝের টাইলস তুলে গর্ত খুঁড়ে তাঁকে কবর দিয়েছি। গরমে মরদেহগুলো পচে যাচ্ছে। আমি কী বলব? খার্তুমের কিছু কিছু এলাকা এখন কবরস্থানে পরিণত হয়েছে।’

গত মাসে ওমর খার্তুমের আল-ইমতিদাদ জেলায় তাঁর বাড়ি থেকে কয়েক মিটার দূরে রাস্তার পাশে চারজনের জন্য কবর খুঁড়েছেন। শুধু যে তিনি এমনটা করছেন তা নয়, তাঁর মতো অনেকেই এই কাজ করছেন।

ওমর বলেন, যারা মারা গেছেন, তাঁদের অনেকের মরদেহ খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের এলাকাগুলোতে কবর দেওয়া হয়েছে। অন্য মরদেহগুলোকে মোহাম্মদ নাগুইব সড়কের কাছাকাছি এলাকায় দাফন করা হয়েছে।

কতজনকে বাড়িতে বা সুদানের পার্শ্ববর্তী এলাকায় কবর দেওয়া হয়েছে, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। ওমরের ভাষ্যমতে, ‘এ সংখ্যা কয়েক ডজন হবে।’

হামিদ (ছদ্মনাম) নামের আরেকজনেরও একই অভিজ্ঞতার বণর্না দিয়ে বলেছেন, একটি সামরিক উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর তিনি রাজধানী থেকে ১২ কিলোমিটার বাইরে শামবাত শহরের একটি এলাকায় তিন সেনাসদস্যকে দাফন করেছেন।

তিনি আরো বলেন, ঘটনাক্রমে আমি সেই এলাকায় ছিলাম। আমিসহ ছয়জন মৃতদেহগুলোকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করি আনি। এবং চারদিকে আবাসিক ভবন রয়েছে, এমন একটি জায়গায় তাদের দাফন করি।’

হামিদ, একজন সম্পত্তির এজেন্ট যিনি ২০ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন। তিনি মনে করেন যে এটি একটি ‘মানবিক কাজ’। তিনি বলেন, ‘এটা জরুরি নয়, তাদের কোথায় কবর দিচ্ছি। তাদের কবর দেওয়াটি বেশি জরুরি। এটি একটি দাতব্য কাজ। তাদের কবরস্থানে নিতে গেলে কয়েক দিনও লেগে যেতে পারত। আর চারদিকে হামলাকারীরা লুকিয়ে আছে। আমরা সমাজকে স্বাস্থ্য বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। এটি একটি ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।’

'সত্যকে কবর দেওয়া'

উদ্দেশ্য সৎ থাকার পরও এই উদ্যোগ অজান্তেই যুদ্ধাপরাধের প্রমাণগুলোকে নষ্ট করে দিতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের ইউনিয়নের প্রধান ডাক্তার আতিয়া আবদুল্লাহ আতিয়া। যেভাবে দাফন করা হচ্ছে, সেটা ‘অপেশাদার’ পদ্ধতি। এর মধ্য দিয়ে ‘সত্যের কবর’ হতে পারে বলে সতর্ক করেন আতিয়া। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে লোকজনকে কীভাবে মারা হয়েছে, সেই সূত্রগুলোও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসক আতিয়া বলেন, মৃতদেহগুলোকে শনাক্ত করে সময়মতো ও মর্যাদার সঙ্গে দাফন করা উচিত। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের দাফনের প্রক্রিয়াটি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, রেডক্রস এবং সুদানিজ রেড ক্রিসেন্টের ওপর ছেড়ে দেওয়ার ওপর জোর দেন।

মৃতদের এভাবে দাফন করা ন্যায়সঙ্গত নয়। দাফনের প্রক্রিয়ায় সরকারী প্রতিনিধি, প্রসিকিউশন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং রেড ক্রসের উপস্থিতি থাকা উচিত। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে কেন তিনি বিশ্বাস করেন যে এমন একটি দেশে এই অনুশীলনগুলি অনুসরণ করা সম্ভব হবে যেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, তিনি বলেছিলেন যে বিদেশী দেশগুলির ভূমিকা পালন করা উচিত।

ওমর ও হামিদ নামে দুই স্বেচ্ছাসেবক দুজনেই বলেছেন, তারা মৃতদের দাফন করার আগে মরদেহের ছবি তুলে রাখছেন, যাতে ভবিষ্যতে শনাক্ত করা যায়। তবে আতিয়া সতর্ক করে বলছেন, যেভাবে দাফন করা হচ্ছে, তাতে অসুখ–বিসুখ ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, মৃতদেহগুলো এত অগভীর স্তরে দাফন করা হচ্ছে যে কুকুর বা অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী খুব সহজেই সেগুলো তুলে ফেলতে পারবে। মরদেহ ঠিকমতো দাফন করা হচ্ছে না। সে জন্য কবরের ওপর ভারী কিছু বা ইট দেওয়া প্রয়োজন।

তবে হামিদ বলেন, সুদানের বেশির ভাগ মানুষই যারা মরদেহ দাফন করছেন, তারা ঠিকভাবে কবর খুঁড়ছেন। অন্তত মাটির এক মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করছেন। কিছু কিছু মরদেহ নিয়ম মেনে দাফন করা হচ্ছে।

গত ১১ মে সুদানের দুই চিকিৎসক বোন মাগদোলিন ও মাগদা ইউসেফ ঘালিকে তাদের বাড়ির বাগানে কবর দেওয়া হয়। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ভাই নাম না প্রকাশের শর্তে বিবিসির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। তিনি বলেন, দুই বোনকে সেখানে কবর দেওয়াই ছিল ‘একমাত্র সমাধান’।

অশ্রুসিক্ত অবস্থায় নিহত দুই বোনের ভাই বলেন, দুটি মরদেহ ১২ দিন পড়ে ছিল। আশপাশের লোকজন পচা গন্ধ আসছে বলে জানাচ্ছিল। তাই স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় বাগানে একটি কবরেই দুজনকে দাফন করা হয়েছে। আমার বোনদের এমন পরিণতি হবে, আমি কোনো দিন কল্পনাও করিনি।

রেডক্রস ও সুদানিজ রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে মিলে মরদেহগুলো কবরস্থানে নিতে কাজ করছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দুই পক্ষের চলমান লড়াই এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে গত ১৫ এপ্রিল থেকে সুদানে সংঘাত চলছে। এক পক্ষে রয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। অন্য পক্ষে আছেন আরএসএফের প্রধান সাবেক মিলিশিয়া নেতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো ওরফে হেমেদতি। এই দুই জেনারেল সম্মিলিতভাবে ২০২১ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সুদানের ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তবে আরএসএফকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। আরএসএফকে সামরিক বাহিনীতে একীভূত করার সময় কে সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হবেন, সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!