এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েছে টাইটানিক ডুবে যাওয়ার। কিন্তু ডুবোযান টাইটানের বিস্ফোরণ ও অভিযাত্রীদের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আবারো পুনরাবৃত্তি হলো আরেক ইতিহাসের। তবে ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে যায় আমেরিকার লাস ভেগাসের বাসিন্দা জে ব্লুম।
শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ব্লুম জানিয়েছেন, তিনি এবং তার ২০ বছর বয়সি পুত্র সিনকে টাইটানে চড়ে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বন্ধু তথা ওশানগেট সংস্থার অন্যতম অংশীদার স্টকটন রাশ। জানিয়েছিলেন যে, মৌসুমের শেষ সফরের জন্য আর মাত্র দুইটি আসন ফাঁকা রয়েছে।
.png)
রাশের অনুরোধ সত্ত্বেও টাইটান সাবমেরিনে চেপে আটলান্টিকের অতলান্তে যেতে চাননি ব্লুম। কাজের ব্যস্ততাকে ঢাল করলেও পুরো ব্যবস্থাপনার মধ্যে অনেক নিরাপত্তা সংক্রান্ত গলদ লক্ষ্য করেছিলেন তিনি। এতদিন পর সে কথা অকপটে স্বীকার করে নেয়ার পাশাপাশি প্রাণে বেঁচে যাওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন লাস ভেগাস-ভিত্তিক বিনিয়োগকারী জে ব্লুম।

ব্লুম বন্ধুর প্রস্তাব নাকচ করায় ওই দুই আসনের যাত্রী হিসাবে আটলান্টিকের গভীরে পাড়ি দেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী শাহজাদা দাউদ এবং তার পুত্র সুলেমান দাউদ। তার পরের ঘটনা এখন পুরো পৃথিবীই জানে।
গত ১৮ জুন গ্রিনিচ সময় অনুযায়ী (জিএমটি) দুপুর ১২টা নাগাদ পাঁচ অভিযাত্রীকে নিয়ে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শনে আটলান্টিকের ১৩ হাজার ফুট গভীরে নেমেছিল টাইটান। সমুদ্রের উপরে থাকা সহযোগী জাহাজ ‘পোলার প্রিন্স’কে প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর সিগন্যাল পাঠানোর কথা ছিল টাইটানের। কিন্তু দুপুর পৌনে ২ট নাগাদ টাইটানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে টাইটানের ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও টাইটান না ফেরায় আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাছে খবর পৌঁছায়।
২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও টাইটানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। ১৯ জুন আমেরিকা এবং কানাডার উপকূলরক্ষী বাহিনী টাইটানের খোঁজে নামে। সমুদ্রের ৪০০০ মিটার গভীরে শব্দ নিরীক্ষণ যন্ত্র পাঠানো হয়। সিএনএন এবং রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই শব্দযন্ত্রের মাধ্যমে ৩০ মিনিট অন্তর বেশ কয়েকটি জোর শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
কোথায় থেকে শব্দ এসেছিল সেটি চিহ্নিত করে ২১ জুন দূরনিয়ন্ত্রিত একটি সমুদ্রযানকে পানির গভীরে পাঠানো হয়। ৯৬ ঘণ্টার মতো অক্সিজেন ছিল টাইটানে। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তিন দিন কেটে যায়, ফলে অক্সিজেনের পরিমাণও কমছিল। তাই দ্রুত উদ্ধারের জন্য আরও দু’টি দূরনিয়ন্ত্রিত সমুদ্রযান পাঠানো হয়। কিন্তু তখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি টাইটানের। বৃহস্পতিবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪৮ মিনিটে আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনী জানায়, টাইটানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে।

অনুমান করা হচ্ছে, পানির প্রবল চাপে ডুবোযানটি দুমড়ে যায়। এই ধরনের ডুবোযান কার্বন ফাইবার এবং টাইটানিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয়। যদি তাতে কোনো ত্রুটি থাকে বা কোনো ভাবে চিড় ধরে তা হলে দুমড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ভাবেই হয়তো শেষের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছিল ডুবোযানের। ওই পানির চাপে কোনো মানুষেরই বেঁচে থাকার কথা নয়। উপরন্তু, সামুদ্রিক প্রাণীর আক্রমণও দেহ না পাওয়ার নেপথ্যে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই দুর্ঘটনায় মৃত শাহজাদা এবং তার পুত্রের প্রতি শোকজ্ঞাপন করে টাইটানের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ব্লুম। জানান যে, ভিডিও গেমের একটি জয়স্টিকের মাধ্যমে টাইটানকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এমনকি আপৎকালীন পরিস্থিতিতে যাত্রীরা যে ভেতর থেকে টাইটানকে খুলতে পারবেন না, সে কথাও জানতে পারেন ব্লুম।
সে সব দিক বিবেচনা করেই, ছেলের উৎসাহ সত্ত্বেও গভীর সমুদ্র অভিযানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যদিও বন্ধু রাশের যে এর পিছনে কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, সে কথা উল্লেখ করে ব্লুম বলেন, ওর কাছে এটা স্বপ্ন ছিল। ও খুব ভালো একটা মানুষ। আমি ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু ও ভীষণ জেদি আর একগুয়ে ছিল।