ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

বাইডেনের পুনর্নির্বাচনকে যেভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:৪৭, ১৪ মে ২০২৪
বাইডেনের পুনর্নির্বাচনকে যেভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ
ফাইল ফটো

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভার্জিনিয়া রাজ্যে নির্বাচনি প্রচারণা অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় ফিলিস্তিনপন্থি এক বিক্ষোভকারী চিৎকার করে বলেন, ‘জেনোসাইড জো, গাজায় কত শিশু হত্যা করেছো?’

মাত্র কয়েক সেকেন্ড তার এই চিৎকার শোনা যায়, কারণ সাথে সাথেই দলীয় কর্মীরা প্রেসিডেন্টকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় ‘আরো চার বছর, আরো চার বছর’ স্লোগান দিতে শুরু করে। এতে বিক্ষোভকারীর স্লোগান চাপা পড়ে যায়।

এটি ছিল ২৩ জানুয়ারির ঘটনা। যখন বাইডেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হয়েছেন, কিন্তু প্রাইমারি নির্বাচনে তখনও প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডেলিগেট পাননি। তবে ততদিনে জো বাইডেনের পুনরায় প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পথে গাজায় ইসরায়েল এবং হামাসের যুদ্ধ মোকাবেলা করা একটি কঠিন সমস্যা হিসাবে আবির্ভূত হয়।

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একশোরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের জোয়ারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মি. বাইডেন আগের চেয়ে আরও বেশি বাধার মুখে পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। এই বিক্ষোভে দুই হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে সশস্ত্র হামলা চালানোর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জেনোসাইড জো’ নামটি ছড়িয়ে পড়ে। হামাসের এই হামলায় ১ হাজার ২শ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং আরও প্রায় আড়াইশ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায় তারা, যার ফলে এখন যুদ্ধ চলছে।

২৮ অক্টোবরের মধ্যে ডেট্রয়েটে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এটি বহুল উচ্চারিত একটি স্লোগান হয়ে দাঁড়ায়।

যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোয় বাইডেন যখন ইসরায়েল সরকারের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেওয়ার কথা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আরব-মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং বাম-গণতান্ত্রিক ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন এটি স্পষ্ট ছিল না যে গাজায় যুদ্ধ এত দীর্ঘ মাস ধরে চলবে এবং অনেক মানুষ হতাহত হবে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, যা তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অসন্তোষের ঝড় বইয়ে দিয়েছে যারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছে।

এই তরুণরা এবং তাদের কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গির অন্যান্য সংখ্যালঘু যেমন- ল্যাটিনো, এশিয়ান, আফ্রিকান-আমেরিকান, এলজিবিটি সম্প্রদায়ের সদস্যরা মূলত ডেমোক্র্যাট পার্টির ভোটার হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। এদের সমর্থন বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করতে সক্ষম যা পেলে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন বাইডেন।

এদিকে গত বছরের ৭ অক্টোবরের হামলার পর বাইডেন হামাসের আক্রমণের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।

একই সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েল ভ্রমণ করেন তিনি এবং ইরান, লেবাননের হেজবুল্লাহ মিলিশিয়াসহ ওই অঞ্চলে হামাসের অন্যান্য মিত্র যেন সংঘাত বাড়াতে না পারে তা সতর্কতা হিসেবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেন।

ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ হতাহত যে হয়েছে তা নয় বরং নেতানিয়াহু সরকারের কঠোরতার কারণে গাজায় খাদ্য ও মানবিক সাহায্যের প্রবেশও কমে যায়। এর ফলে জাতিসংঘ, এনজিও এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার কঠোর সমালোচনা করলেও বাইডেন তখন থেকেই ইসরায়েলের প্রতি তার সমর্থনে অবিচল আছেন - অন্তত জনসমক্ষে।

ফিলিস্তিনিপন্থি গোষ্ঠীগুলো একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও বাইডেন সরকার সাময়িক বিরতির সমর্থন করেন, যা ২০২৩ সালের নভেম্বরে হয়েছিল। ওই যুদ্ধবিরতির কারণে গাজায় বড় আকারে সহায়তা প্রবেশ করতে শুরু করে। সেইসাথে একশ ইসরায়েলি জিম্মি এবং সেখানে বন্দি প্রায় ২৪০ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হয়।

একই সময়ে গাজায় আরও মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের হোয়াইট হাউসও গাজায় এত পরিমাণ বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনায় বারবার বিরক্তি প্রকাশ করে।

এপ্রিলের শুরুতে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে যে বাইডেন নেতানিয়াহুকে বলেছেন, ‘মানবিক পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য’ এবং ‘বেসামরিকদের ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক দুর্ভোগ মোকাবেলা করতে সেইসাথে গাজায় নিয়োজিত দাতব্য কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের গাজা সম্পর্কিত মার্কিন নীতিতে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।

তবে একই সময়েও হোয়াইট হাউস ইসরায়েলে অস্ত্রের চালান বজায় রেখেছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছে যাতে ইসরায়েলকে তাদের বিরুদ্ধে আসা প্রস্তাবগুলো থেকে রক্ষা করা যায়। এই পদক্ষেপগুলো ফিলিস্তিনপন্থি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের তীব্র আপত্তির মুখে পড়ে।

জেরেমি কোনিন্ডিক, যিনি বাইডেন এবং বারাক ওবামা সরকারের হয়ে কাজ করেছেন এবং এখন এনজিও রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালের সভাপতিত্ব করছেন, তার ধারণা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধকে নিজের করে তুলেছেন।

কোনিন্ডিক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘তারা এমন সব সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে যাতে যুদ্ধ টিকে আছে। এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে তারা রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। তারা জাতিসংঘে কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলের পাশে থেকেছে যা যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘বাইডেন কি এই যুদ্ধ চাইবেন? না। কিন্তু বাইডেন কি এই যুদ্ধ বস্তুগতভাবে সমর্থন করছেন? হ্যাঁ এবং তাই সেই অর্থে, এটি তারই যুদ্ধ।’

এই অস্থিরতা প্রথম রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ পায় প্রাইমারির সময় যখন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছিল। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিনিধিদের অনেকে বাইডেনকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি।

এ ধরনের ‘আনকমিটেড আন্দোলন মিশিগানে দেখা গিয়েছিল, যেখানে তারা এক লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছে (১৩ শতাংশের মতো)। এটি মিনেসোটায় (প্রায় ১৯ শতাংশ ভোট), হাওয়াইয়ে (২৯ শতাংশ) এবং ওয়াশিংটনে (প্রায় ১০ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য ফল অর্জন করে।

যে রাজ্যগুলোয় ‘আনকমিটেড’ অপশন ছিল, সেখানে মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ, গড়ে ১০ শতাংশ ভোটারা ‘আনকমিটেড’ অপশনের পক্ষে ভোট দিয়েছে।

যে রাজ্যগুলোয় আনকমিটেড অপশন ছিল না সেখানকার ১২ শতাংশ ভোট বাইডেন ছাড়া অন্য প্রার্থীদের পক্ষে পড়েছিল। ‘আনকমিটেড’ মুভমেন্টের তথ্যমতে তাদের এই আন্দোলনের পক্ষে অন্তত পাঁচ লাখ ভোট পড়েছে।

এই ফলাফলগুলো হেলাফেলা করার মতো নয়, কেননা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পেছনে বড় কারণ ছিল তিনি অ্যারিজোনা, জর্জিয়া, মিশিগান, নেভাডা, পেনসিলভানিয়া এবং উইসকনসিনের মতো অতি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজ্যগুলোয় ভোট পেয়েছিলেন।

এসব রাজ্যের অনেকগুলোয় তিনি খুব অল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন এবং তার জয়ী হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে তরুণদের মতো নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের ভোট।

সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে- প্রেসিডেন্ট বাইডেন ভোটারদের মধ্যে তার জায়গা হারাচ্ছেন।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি-বাংলাদেশ/মাহাদী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!