যুক্তরাষ্ট্র ঋণ-খেলাপি হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় ঘটতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার তার খরচ বহনের জন্য যে অর্থ ধার করে। ব্যাংক অব আমেরিকার বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ মিখায়েল হার্টনেট মনে করেন, ১০০ দিনের এই রীতিতেই ঋণ ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার হবে। ঋণমান সংস্থা মুডিস ইনভেস্টর সার্ভিস গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণমান স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচকে নিয়েছে। সংস্থাটির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতায় ঝুঁকি বাড়ছে। এই অবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়ে মুডিস বলেছে, তা না হলে রাজস্ব ঘাটতি ব্যাপকভাবে বাড়বে।
এতে দেশটির ঋণ সামর্থ্য উল্লেখযোগ্য হারে দুর্বল হবে। দেশটিতে এত ঋণের বোঝা বাড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কভিড-১৯ মহামারিতে সরকারি ঋণের পরিমাণ ঊর্ধ্বমুখী হয়। কভিডজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি পুনরুদ্ধারে বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা বিতরণ করে ওয়াশিংটন। ফলে ঋণের পরিমাণও বাড়তে থাকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ব্যয় যে হারে করছে, তাতে দেশটির ঋণ আরো বাড়বে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনকে বড় অঙ্কের সহায়তা দিচ্ছে তারা, যদিও ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের জের এখনো টানছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে বিপুল সমরাস্ত্র সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
আইএমএফ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ বিশ্বজুড়ে ঋণ নেয়ার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, একই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ করছে। সংস্থাটি বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং উচ্চ সুদহার দেশটির ট্রেজারি ইল্ড (বন্ড বিনিয়োগকারীর প্রাপ্ত আয় বা সুদ) বাড়াচ্ছে। এতে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সুদহার বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে।
.png)
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ঋণ ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঋণ ছিল ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার, একই বছরের ১৫ জুন ছিল ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার, তার আট মাস আগে ছিল ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ বছর দেখা গেছে, ১০০ দিনেই ঋণ এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার করে বাড়ছে। বর্তমানে এই ঋণ ৩৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে
একটি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ‘প্যানমিউর গর্ডনের’ প্রধান অর্থনীতিবিদ সাইমন ফ্রেঞ্চের ভাষায়, যদি এরকম কিছু আসলেই ঘটে, তখন এই বিপর্যয়ের তুলনায় ২০০৮ সালের বিশ্ব ব্যাংকিং এবং আর্থিক সংকটকে এক সামান্য বিষয় বলে মনে হবে। ২০০৮ সালের ঐ সংকটের সময় বিশ্বের বড় বড় বহু ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক মন্দা দেখা দিয়েছিল।
যদি যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো না হয়, তখন সরকার আর নতুন করে অর্থ ধার করতে পারবে না। এর ফলে দ্রুত সরকারের হাতে অর্থ ফুরিয়ে যাবে, তারা আর দায়-দেনা পরিশোধ করতে পারবে না, জনগণকে যেসব সুযোগ-সুবিধা-সেবা দিতে হয়, সেগুলোও অব্যাহত রাখতে পারবে না।
তখন সরকার বাধ্য হবে জনগণকে কল্যাণ ভাতা এবং যেসব অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়, যে সাহায্য দেয়, তা বন্ধ করতে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে, মানুষ তাদের ব্যয় মেটাতে পারবে না। আর পরিণামে মার্কিন অর্থনীতিতে এর ধাক্কা লাগবে, বলছেন এ জে বেল বলে একটি প্রতিষ্ঠানের ইনভেস্টমেন্ট ডিরেক্টর রাস মোল্ড।
হোয়াইট হাউসের ‘কাউন্সিল অব ইকোনোমিক এডভাইজার্স’ হিসেব করে দেখেছে, সরকার যদি একটা দীর্ঘসময় পর্যন্ত ঋণের সীমার ব্যাপারে কোন সমাধানে পৌঁছাতে না পারে, মার্কিন অর্থনীতি ৬ দশমিক এক শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স কলেজের প্রেসিডেন্ট এবং নামকরা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আল-এরিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ঋণ-খেলাপি হয়, তখন পুরো মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে বাকী বিশ্বে। যেমন যুক্তরাজ্যে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিপুল ব্যবসা-বাণিজ্য করে।
আল-এরিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু সারা বিশ্বজুড়ে সব দেশের সঙ্গেই ব্যবসা-বাণিজ্য বড় অংশীদার। মন্দায় পড়লে তারা বাকী বিশ্ব থেকে জিনিসপত্রও কিনবে অনেক কম। তবে তিনি মনে করেন না, মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে সেটি ব্রিটিশ অর্থনীতিকেও থমকে দেবে।
ফ্রেঞ্চ অবশ্য এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেন। তার মতে, মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা মানে হচ্ছে ব্রিটিশ অর্থনীতিও নিশ্চিতভাবেই মন্দায় পড়বে।
বাড়ি কেনার ঋণের খরচ বাড়বে
যুক্তরাষ্ট্র ঋণ খেলাপি হওয়ার মানে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যেই মন্দা নয়, এর প্রভাব পড়বে বাড়ি কেনার ঋণ হতে শুরু করে আরও অনেক কিছুর ওপর। ফ্রেঞ্চ বলেন, যুক্তরাজ্যে এর ফলে বাড়ি কেনার ঋণের খরচ বেড়ে যাবে, বাড়বে বেকারত্ব। এটি হবে রীতিমত এক প্রলয়-কাণ্ড, বলছেন তিনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির একটি সমস্যার কারণে যুক্তরাজ্যে কেন বাড়ি কেনার ঋণের খরচ বাড়বে?
যখন কোন সরকার অর্থ ধার করতে চায়, তারা বন্ড বিক্রি করে। যুক্তরাষ্ট্রে এই বন্ডের নাম ‘ট্রেজারি বন্ড’, আর যুক্তরাজ্যে এরকম বন্ডকে বলা হয়, ‘গিল্ট’। একজন বিনিয়োগকারী যখন সরকারের কাছ থেকে এরকম বন্ড বা গিল্ট কেনেন, তখন তিনি বিনিয়োগ করা অর্থের জন্য সরকারের কাছ থেকে সুদ পান।
তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার ঋণ পরিশোধ না করে বা এমনকি সুদের অর্থও পরিশোধ না করে, তখন বিনিয়োগকারীরা ভাববে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঋণ-খেলাপি হতে পারে, তাহলে যুক্তরাজ্যের সরকারও যে হবে না, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তখন বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাজ্যে সরকারী বন্ড কেনার জন্য আরো বেশি সুদ দাবি করবে।
তিনি বলেন, যে কোন ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয় এই ঋণ দেয়ার ঝুঁকি কতটা তার উপর ভিত্তি করে, সেটি বাড়ি কেনার জন্য দেয়া ঋণই হোক, বা সরকারের ধার করা ঋণই হোক। কাজেই যখন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যখন ঋণ-খেলাপি হবে সেটা বিরাট বড় এক ঝুঁকির ঘটনা, এবং তখন রাতারাতি সব ধরণের ঋণের সুদের হার কিন্তু অনেক বেড়ে যাবে।
জিনিসপত্রের দাম বাড়বে
মার্কিন ডলার হচ্ছে গোটা বিশ্বের জন্য রিজার্ভ মুদ্রা। এর মানে হচ্ছে, সারা বিশ্বে যত ধরণের পণ্যের লেন-দেন হয়, যেমন জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে গম- সবকিছুর দাম কিন্তু নির্ধারিত হয় ডলারে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ঋণ খেলাপি হয়, সাথে সাথে ডলারের দাম নাটকীয়ভাবে পড়ে যাবে।
মনে হতে পারে, এটা তো বাকী বিশ্বের জন্য ভালো খবর। কিন্তু ফ্রেঞ্চ বলছেন, এর মানে হচ্ছে, যারা বিশ্বে পণ্যের বাজারে বিনিয়োগ করে, তারা তখন জানবে না, কীভাবে তাদের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
“যখন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এভাবে ঋণ-খেলাপি হবে, তখন কিন্তু হঠাৎ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতংক তৈরি হবে। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করবে, এরপর কি জাপান? যুক্তরাজ্যেও কি একই ঘটনা ঘটবে? তারপর কি জার্মানি? এরপর আর কারা ঋণ-খেলাপি হবে”, বলছেন তিনি।
তখন আমাদেরকে হঠাৎ সবকিছুর দাম নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থনীতির পরিভাষায়, এর নাম ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’, অর্থাৎ বাড়তি ঝুঁকি। তখন সব কিছুর দামের মধ্যে এই বাড়তি ঝুঁকির খরচ যুক্ত হবে। কাজেই রুটির দাম পর্যন্ত বেড়ে যাবে। যদি খাদ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি তেল, সবকিছুর দাম বেড়ে যায়, তখন কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।
পেনশন কমে যাবে
মোল্ড বলেন, বিশ্বের শেয়ার বাজারের ৬০ শতাংশ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। কাজেই পেনশন তহবিলের যে অর্থ মার্কিন শেয়ারে বিনিয়োগ করা আছে, সেগুলো কিন্তু ঝুঁকিতে পড়বে। লোকে হয়তো জানেই না যে তাদের পেনশনের অর্থ সেখানে বিনিয়োগ করা। আর যুক্তরাষ্ট্র ঋণ-খেলাপি হলে শেয়ার বাজারে তার বাজে প্রতিক্রিয়া হবেই। তবে সবকিছুই দুঃসংবাদ বলে ধরে নেয়া ঠিক হবে না।
২০১১ সালেও ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকানরা ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নিয়ে এরকম অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন, সেই অচলাবস্থার নিরসন হয়েছিল ঋণ-খেলাপি হওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। তখন মার্কিন শেয়ার বাজারে ধস নেমেছিল। তবে এই আতংক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, নাটকীয়ভাবে পড়ে যাওয়া শেয়ার বাজার আবার পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। মোল্ড মনে করছেন, এবারেও হয়তো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
তিনি বলেন, তবে এই মূহুর্তে যারা পেনশনের টাকা তুলছেন, তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে। কিন্তু যারা তাদের পেনশনের অর্থ নেয়া শুরু করবেন আরও পরে, তাদের বেলায় শেয়ার বাজারের এই পতনের ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য হয়তো সময় পাওয়া যাবে।