সাম্প্রতিক বিষয় হিসেবে নৃবিজ্ঞান কেমন, গবেষণা ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানের ভূমিকা, উচ্চশিক্ষায় নৃবিজ্ঞান ও প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ আইনুল হক।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কুবি প্রতিনিধি রকিবুল হাসান।
.png)
ডেইলি বাংলাদেশ: নৃবিজ্ঞান কী ও নৃবিজ্ঞানে কেন পড়ব?
মোহাম্মদ আইনুল হক: নৃবিজ্ঞান হলো মানুষ সম্পর্কিত সামগ্রিক অধ্যয়ন। মানুষের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমগ্রতাকে বোঝার চেষ্টা করে, যেখানে মানব সভ্যতার সমস্ত দিক বিশ্লেষণ করা হয়। এটি একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র যা মানুষের সংস্কৃতি, জীববিজ্ঞান, ইতিহাস এবং ভাষা অন্তর্ভুক্ত করে। নৃবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবসমাজ এবং সংস্কৃতির বিবর্তন ও বৈচিত্র্য বোঝা।
বাংলাদেশের প্রায় আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান পড়ানো হয়। বেশকিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও নৃবিজ্ঞান পড়ানো হয়। কিন্তু, তুলনামূলক এর বিস্তৃতি অনেক কম। নৃবিজ্ঞান পড়লে সর্বপ্রথম সে মানুষ হিসেবে তার পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলোকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে। তার সমাজ, সংস্কৃতি, হিউম্যান টু হিউম্যান ইন্টারেকশন, হিউম্যান টু নন হিউম্যান ইন্টারেকশন বুঝার ক্ষেত্রে বড় একটা সুযোগ তৈরি করে নৃবিজ্ঞান।
ডেইলি বাংলাদেশ: গবেষণা ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানের ভূমিকা কী?
মোহাম্মদ আইনুল হক: গবেষণা ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গবেষণার ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞান অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে আলাদা, কারণ গবেষণায় নৃবিজ্ঞানের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। মেথডলজির জায়গায় নৃবিজ্ঞান অনেক সমৃদ্ধ। একজন গবেষক হয়ে উঠার জন্য নৃবিজ্ঞান পড়া জরুরি। যারা নৃবিজ্ঞানে ভর্তি হচ্ছে তারা যদি বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয় তাহলে তারা একজন ভালো গবেষক হতে পারবে এবং এরই সঙ্গে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। কারণ, সে তার সমাজ সংস্কৃতি ও মানুষকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে। নৃবিজ্ঞান অধ্যয়নের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গবেষণা সম্পর্কে বিশদ এবং বিস্তারিত জানা। আমরা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করি সেখানে সামাজিক সাংস্কৃতিক ইস্যু বা বৈশ্বিক বিষয় রয়েছে। আমরা যদি ক্লাইমেট চেঞ্জের কথা বলি, জেন্ডারের কথা বলি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কথা বলি এসব সমসাময়িক বৈশ্বিক ইস্যু বা বিষয় নিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা প্রায়োগিকভাবে কাজ করছে, গবেষণা করছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন- ইউনিসেফ, ইউএসএআইডি, ডাবলিওএইচও, ইউএনএপিএ, আইসিডিআরআরবি, অ্যাকশন এইড বা দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নৃবিজ্ঞানীরা কৃতিত্বের সঙ্গে গবেষণা করছে। সমস্যার সমাধানের জন্য প্রকৃত কারণগুলো খুঁজে বের করছে।
ডেইলি বাংলাদেশ: নৃবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করার পর কাজের বিস্তৃতি কতটুকু?
মোহাম্মদ আইনুল হক: নৃবিজ্ঞানী হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের বেশকিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যেমন- পরিকল্পনা কমিশন, অর্থনীতি কমিশন এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে কাজ করতে পারে। কিছুদিন আগেও বৈশ্বিক মহামারির কোভিড-১৯ এর সময় আমরা দেখেছি মেডিকেল সায়েন্স এর পাশাপাশি আচরণগত বিষয়গুলো নিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা কার্যকরভাবে কাজ করেছে। মানুষের আচার-আচরণ অধ্যয়নে, এবং আচার আচরণ পরিবর্তনে নৃবিজ্ঞানীরা কাজ করেন। এছাড়া একটা রোগের প্রেক্ষাপট, ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে পারে। বর্তমানে মেডিকেল অ্যানথ্রোপোলজি বা পাবলিক হেলথ নিয়ে অনেক নৃবিজ্ঞানী গবেষণা করছে, তারা এই সেক্টরে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে।
বাংলাদেশের প্রথম সারির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইসিডিডিআরবি’ সেখানেও কিন্তু নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই কাজ করছে। একজন ডাক্তার যে ভূমিকায় কাজ করছে সেখানে কিন্তু নৃবিজ্ঞানীরাও একই ভূমিকায় কাজ করছে। এগুলো নিয়ে তাদের বেশকিছু ভালো ভালো গবেষণা আছে, যা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এই গবেষণার ফলাফল দিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে সামাজিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন অনেকে। এই জ্ঞানকাণ্ডটা শুরুটা পশ্চিমা বিশ্ব দ্বারা হলে ও এটির চর্চা এখন বৈশ্বিক।
ডেইলি বাংলাদেশ: বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সুযোগ কেমন?
মোহাম্মদ আইনুল হক: উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানের সম্ভাবনা অনেক। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য নৃবিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স করে বিদেশে যাচ্ছে। পৃথিবীর নামকরা প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদেশে নৃবিজ্ঞানীদের চাকরির বাজার অনেক প্রসারিত। সেখানে তারা বিভিন্নক্ষেত্রে চাকরি করছে। বিদেশি বড় বড় কোম্পানি নৃবিজ্ঞানীদের আলাদা একটা জায়গা তৈরি করে দিয়েছে। নৃবিজ্ঞানীরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এ কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের জন্য বাংলাদেশে বিষয় হিসেবে নৃবিজ্ঞান সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।
আমাদের দেশে কালচারাল অ্যানথ্রোপোলজি নিয়ে বেশি চর্চা হলেও বিদেশে তার পাশাপাশি মেডিকেল অ্যানথ্রোপোলজি, আর্কিওলজিক্যাল অ্যানথ্রোপোলজি, ভিজুয়াল অ্যানথ্রোপোলজি, লিঙ্গুইস্টিক অ্যানথ্রোপোলজি এগুলো নিয়ে বেশ চর্চা হয়।
ডেইলি বাংলাদেশ: বাংলাদেশে বিষয় হিসেবে নৃবিজ্ঞান বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা?
মোহাম্মদ আইনুল হক: বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো শিক্ষাদান ও গবেষণার জন্য মাতৃভাষায় পর্যাপ্ত বইপত্র বা গবেষণাপত্র নাই। যেহেতু বাংলাদেশে এর চর্চার ইতিহাস বেশি পুরোনো না, তাই নৃবিজ্ঞান ঐভাবে পরিচিতি পায়নি। এ কারণে চাকরির বাজারে এতটা সুযোগ তৈরি হয়নি। যদি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসমূহ গবেষণার জন্য নৃবিজ্ঞানীদের নিয়ে গবেষণা করে তাহলে আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য পাবে, কিন্তু এখানে ঐভাবে সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এছাড়া গবেষণার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতি সহায়তার অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি বিষয় হিসেবে নৃবিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে এর চর্চা বাড়বে এবং চাকরির ক্ষেত্রেও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়া জাতীয়ভাবে বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানীদের নিজেদের কোনো সংগঠন নেই। কিন্তু, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, সমাজবিজ্ঞান সমিতি রয়েছে। যদি এখানে নৃবিজ্ঞানের এমন কোনো সংগঠন থাকত, তাহলে জাতীয়ভাবে সেমিনার সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ হতো, সেখানে কে কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে এগুলো নিয়ে আলোচনা হতো, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হতো। যার ফলে অনেকে অনুপ্রেরণা পেতেন, কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠতেন। এখান থেকে আরো বেশি গবেষণা উঠে আসত।