ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ শিশুকিশোর ]

পাগলের ছাগল ছানা

ফারুক আহম্মেদ জীবন
প্রকাশিত: ১৬:৫৪, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাগলের ছাগল ছানা
সময়মত ঘুমাও, গোসল খাওয়া-দাওয়া করো। দেখো আবার ছ'মাস পর তোমার ছাগল, ছানা দেবে।  তোমার ধাড়ি ছাগলটাকে যত্ন করে খাওয়াও। মন্টু তার বাবা- মার মুখে ওসব কথা শুনে আবার যেনো নতুন করে আশার আলো দেখতে পেলো।

মন্টু ছেলেটা একটু পাগল গোছের। যাকে বলে কোলে হাবলা। কিন্তু সে বেশ ভ্যাজাইল্লা গোছের ছেলে একটা। সে যখন যেটা বায়না করে। তখন তার মা-বাবাকে সেটা কিনে দিতে হয়। বয়স দশ বারো বছর হবে। দশ বারো বছর বয়স হলে কি হবে। কিন্তু সে একেবারে ছোট্ট চার পাঁচ বছরের বাচ্চাদের মতো। 
মন্টু পাগল গোছের বলে। গ্রামের ওর বয়সী। ওর চেয়ে বয়সে ছোট ছেলে- মেয়েরা ওকে মন্টু পাগল মন্টু পাগল বলে ক্ষ্যাপায়।

পাগল হলেও মা- বাবা তো আর সন্তানকে ফেলে দিতে পারে না। কথায় আছে না....
সন্তান যেমনি হউক কানা, খোঁড়া, নেংড়া, বোবা, কালা
যার কালো, তার মার ভালো। 
ঠিক তেমনি, মন্টুর মা- বাবা, রাহেলা আর রফিক মিয়া
সবসময় চেষ্টা করে তাদের ছেলে মন্টুর সকল চাওয়া- পাওয়া আব্দার পূরণ করার জন্য। মন্টুর বাড়ি যশোর কেশবপুর উপজেলার বাজিতপুর গ্রামে।
আজ মন্টু তার মা- বাবার কাছে কেঁদে কেঁদে বায়না ধরেছে। তাকে একটা ধাড়ি ছাগল কিনে দিতে হবে। 

মন্টুর বাবা রফিক মিয়া মন্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলো। বাবা মন্টু, তুমি ধাড়ি ছাগল কি করবে? মন্টুর কান্নাকাটিতে দু'চোখের জলে যেনো একেবারে কপোতাক্ষের নদী বয়ে চলেছে। সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বললো। 

Advertisement

আমি ধাড়ি ছাগলটাকে আমাদের গ্রামের বিলের পাশে সবুজ ঘাসের মাঠে চরাবো। কাঁঠাল গাছ থেকে পাতা ছিড়ে দেবো। অনেক যত্ন করবো। তারপর ধাড়ির পেটে বাচ্চা হলে। আমি তাদের নাম রাখবো। সেই বাচ্চা যখন বড় হবে। তখন তা- বিক্রি করলে অনেক টাকা হবে। আমি সেই টাকা দিয়ে গাড়ি কিনবো।তারপর সেই গাড়িতে আমি চড়বো।

আমাদের গ্রামের কতো মানুষ গাড়ি চালায়। আমিও গাড়ি চালাবো। ছেলের এমন আকাশকুসুম ভাবনা দেখে হাসতে লাগলো মা- রাহেলা আর বাবা রফিক মিয়া। রাহেলা বললো, আচ্ছা বাবা মন্টু তুমি কান্না থামাও। কাল তোমার বাবা বাজার থেকে তোমার ধাড়ি ছাগল কিনে এনে দেবে। মন্টু আহ্লাদী কন্ঠে বললো সত্যি তো? 

রফিক মিয়া বললো, হ্যাঁ বাবা সত্যি, এবার কান্না থামিয়ে একটু হাসো । মন্টু দু,চোখের পানি মুছে মুখে হাসি ফোটালো। তারপর দিন বাজার থেকে মন্টুর জন্য রফিক মিয়া একটা ধাড়ি ছাগল কিনে আনলো। লম্বা কান ঝোলা কালোসাদা মিশ্রণ রঙের ধাড়ি ছাগল।

দেখে মন্টু তো মহাখুশি। আনন্দে এমন অবস্থা নাওয়া খাওয়ার যেনো সময় নেই এখন তার। সে ছাগলটাকে নিয়ে চরের মাঠে সকাল বিকেল খাওয়াতে নিয়ে যায়।

লতাপাতা ছিড়ে দেয় ছাগলের মুখে। অনেক যত্ন করে তার ধাড়ি ছাগলটিকে। এভাবে একসময় বছর ঘুরতেই মন্টুর সেই ধাড়ির পেট থেকে দুটি বাচ্চা হলো। 

মন্টু তো ছাগলের ছানা দুটো দেখে মহাখুশি। সে তার ধাড়ি ছাগলের ছানা দুটোর নাম রাখলো একটার নাম সোনা। আর একটার নাম মনা। মন্টু ছাগল ছানা দুটোর সোনা মনা বলে ডাক দিতে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে মন্টুর কাছে ছুটে চলে আসে। 

মন্টু আদর করে দু,হাতে ছাগল ছানা দুটোকে কোলে টেনে নেয়। সোনা মনাও আদর পেয়ে মন্টুর গায়ে মুখ ঘষতে থাকে আর হু..হু.হু..ম্যা..ম্যা..করে ডাকতে থাকে। মন্টুর এমন ছেলেমানুষি পাগলামি দেখে রফিক মিয়া আর রাহেলা দু,জনে হাসতে থাকে। 

এর- কিছুদিন পর একদিন মন্টু তার ধাড়ি ছাগল আর ছানা দুটোকে নিয়ে গেল গেল বিলের পাশে একটা ঘন- ঝোপঝাড়ের পাশে কাঁঠাল বাগানে। কাঁঠালের পাতা খাওয়ানোর জন্য সে একটা কাঁঠাল গাছে উঠলো। 

তখন হঠাৎ ঝোপের মধ্য থেকে ওৎ পেতে থাকা একটা শিয়াল এসে একটা ছাগল ছানা ধরে দৌড় দিল। ছাগলের বাচ্চার ম্যা..,ম্যা..ডাক শুনে

মন্টু তাকিয়ে দেখে শিয়াল ছাগল ছানা মুখে কামড়ে ধরে পালাচ্ছে। সে দ্রুত গাছ থেকে নেমে শিয়ালের পিছু দৌড়াতে লাগলো। এদিকে আরেকটি শিয়াল অন্য দিক থেকে এসে আরেকটি বাচ্চা ধরে দৌড় দিল। 

মন্টু তার ছাগল ছানা সোনা মনা কোনোটাকে শিয়ালের কাছ থেকে বাঁচাতে পারলো না। সে দিশেহারা হয়ে পাগলের মতো কান্নাকাটি করতে করতে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগলো। তন্নতন্ন করে বাগান আগান ঝোপঝাড় খুঁজতে লাগলো কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলো না আর তার ছাগল ছানা সোনা মনাকে। সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।

কিকরে এখন সে গাড়ি কিনতে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে ধাড়ি ছাগলটাকে নিয়ে মন্টু কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ফিরে এলো। ছাগল ছানা, সোনা মনাকে হারিয়ে শোকে দুঃখে মন্টুকে অমন কাতর হতে দেখে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে অনেক শান্তনা দিল মন্টুর মা- বাবা। 

বললো..দেখো বাবা মন্টু, আল্লাহ যেটা করেন। তার বান্দার মঙ্গলের জন্য করেন। এতে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। হয়তো এটাতেই মঙ্গল রয়েছে। 

বেশ কয়েক দিন হয়ে গেল মন্টু তার ছাগল ছানা সোনা মনার শোকে তেমন খায় না ঘুমায় না। ওর বাবা রফিক আর মা রাহেলা বললো বাবা মন্টু অতো চিন্তা করো না।

সময়মত ঘুমাও, গোসল খাওয়া-দাওয়া করো। দেখো আবার ছ'মাস পর তোমার ছাগল, ছানা দেবে।  তোমার ধাড়ি ছাগলটাকে যত্ন করে খাওয়াও। মন্টু তার বাবা- মার মুখে ওসব কথা শুনে আবার যেনো নতুন করে আশার আলো দেখতে পেলো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!