২০২১ সাল। নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে শেষ হতে চলেছে বছরটি। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তার অন্যতম কারণ ছিল প্রতারণা, পণ্য সরবরাহ না করা। যার পরিপ্রেক্ষিতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে ভুক্তভোগীরা।
এতে দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ও কিউকমের কর্মকর্তারদের গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যা নিয়ে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে শোরগোল সৃষ্টি হয় আদালতে প্রাঙ্গনে। দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের ফিরে দেখা ২০২১। আজ থাকছে তৃতীয় পর্ব।
.png)
ইভ্যালির বিরুদ্ধে রঙ বাংলাদেশের দুই মামলা:
আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দেশীয় পোশাকের ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশ। গিফট ভাউচার বিক্রি বাবদ ইভ্যালির চেক প্রত্যাখ্যান হওয়ায় অভিযোগে ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলকে আসামি করে ঢাকার আদালতে দুটি মামলা করে রঙ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ।
গুলশান থানায় ইভ্যালির বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা: ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পূর্বগ্রাম এলাকার বাসিন্দা মো. আরিফ বাকের গুলশান থানায় মামলা করেন।
ইভ্যালিকাণ্ডে তাহসান, মিথিলা ও শবনমের বিরুদ্ধে মামলা: ইভ্যালির প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দেশের জনপ্রিয় তিন তারকা তাহসান খান, রাফিয়াত রশিদ মিথিলা ও শবনম ফারিয়াসহ নয় জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় সাদ স্যাম রহমান নামে ইভ্যালির এক গ্রাহক মামলা দায়ের করেন।
ইভ্যালির সিইও-চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনজীবীর মামলা: ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আইনজীবী আলমগীর হোসেন রিগ্যান। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেগম মাহমুদা আক্তারের আদালতে মামলাটি ২৭ সেপ্টেম্বর দায়ের করা হয়েছে।
ইভ্যালির সিইও-চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার মামলা: ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেল ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। গত ৯ ডিসেম্বর ঢাকার মহানগর হাকিম বেগম আফনান সুমির আদালতে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের বাসা থেকে ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেলকে গ্রেফতার করে র্যাব। এরপর বিভিন্ন মামলায় তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। বর্তমানে তারা কারাগারে আটক রয়েছে।
ই-অরেঞ্জ কাণ্ড:
১১০০ কোটি আত্মসাতের অভিযোগে সোনিয়া বিরুদ্ধে মামলা: প্রতারণা করে ১১শ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজধানীর গুলশান থানার দায়ের করা মামলায় রিমান্ড শেষে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমানসহ তিনজন কারাগারে আটক রয়েছে। কারাগারে আটক অপর আসামি হলেন- প্রতিষ্ঠানটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) আমান উল্লাহ।
এর আগে, ২৩ আগস্ট এ মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আসামি সোনিয়া দম্পতিসহ তিন জনের দশ দিন করে রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এ সময় আসামি পক্ষে তাদের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে আবেদন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূইয়ার আদালত প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আত্মসাতের অভিযোগে হাতিরঝিল থানায় মামলা: পণ্য সরবরাহ না করে প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের এক কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান ও চিফ অপারেটিং অফিসার আমান উল্যাহর কারাগারে আটক রয়েছে। গত ৭ অক্টোবর সাজ্জাদ ইসলাম নামে ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী হাতিরঝিল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
গুলশান থানায় মামলা ও আত্মসমর্পণের পর কারাগারে: গত ১৭ আগস্ট প্রতারণার অভিযোগে মো. তাহেরুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী বাদী গুলশান থানায় ই-অরেঞ্জের পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার অপর আসামিরা হলেন- বিথী আক্তার, কাওসার। মামলা করার দিন আসামি সোনিয়া ও তার স্বামী আদালতে আত্মসমর্পণ করে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম আবুবকর ছিদ্দিকের আদালত জামিনের আবেদন খারিজ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর গত ১৮ আগস্ট গুলশান থানার প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ই-অরেঞ্জের পাঁচজনের দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তা মঞ্জুর করে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
সাড়ে ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সোনিয়াসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা: প্রতারণার মাধ্যমে ২৭ গ্রাহকের ৯ কোটি ৫৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২ অক্টোবর ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূইয়ার আদালতে ভুক্তভোগীদের পক্ষে মো. নাসিম প্রধান বাদী হয়ে এ মামলা করেন। এ মামলার অপর আসামিরা হলেন- সোনিয়া মেহজাবিনের স্বামী মাসুকুর রহমান, শেখ সোহেল রানা, মো. আমান উল্লাহ চৌধুরী, জায়েদুল ফিরোজ, নাজনীন নাহার বিথী ওরফে বিথী আক্তার ও নাজমুল হাসান রাসেল।
প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় মামলা: ই-অরেঞ্জেরর মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমানের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এরপর এ মামলায় মাসকুর রহমানের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
কিউকম কাণ্ড:
অর্থ আত্মসাতের মামলায় আরজে নিরব গ্রেফতার: রাজধানীর গুলশান থানায় অর্থ আত্মসাতের মামলায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকমের হেড অব সেলস (কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন) অফিসার হুমায়ুন কবির ওরফে আরজে নিরবকে গ্রেফতার করা হয়। গত ৮ অক্টোবর তাকে রাজধানীর আদাবর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ওই দিনই তেজগাঁও থানার মামলায় নিরবের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ১০ অক্টোবর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ১৮ অক্টোবর লালবাগ থানার একটি মামলায় তার আরো একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ঐ মামলায় রিমান্ড শেষে ২৫ অক্টোবর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর গুলশান থানার মামলায় গত ২৮ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
কিউকমের সিইও রিপন গ্রেফতার: রাজধানীর পল্টন থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রতারণার অভিযোগে ই-কমার্স সাইট কিউকমের সিইও রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ অক্টোবর তাকে ডিবি মতিঝিল বিভাগ গ্রেফতার করে। এরপর এ মামলায় দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
কিউকমের সিইও রিপন বিরুদ্ধে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার প্রতারণার মামলা: রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার প্রতারণার অভিযোগে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরপর এ মামলার তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।