* নেয়া হয় না জোরালো ব্যবস্থা
* ছিনিয়ে নেয়া হয় যাত্রীদের মালামাল
* টাকা দিতে বাধ্য করা হয় যাত্রী নিপাকে
* টাকা ছাড়া পার পাননি যাত্রী লিয়াকত আলী
* প্রতক্ষ্যদর্শীরা যা বলছেন
* আলোচনায় যেসব দালাল
* সরেজমিন যা দেখা যায়
* যা বলছে প্রশাসন
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা জয়নগর আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট যেন দালালদের দখলে। তাদের দৌরাত্ম্যের কারণে এই স্থলেপথে ভারতে যাতায়াতকারী পাসপোর্টধারী যাত্রীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর হয়রানি এড়াতে ভারতগামী বহু যাত্রী বিকল্প পথে বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় দ্রুত এই চেকপোস্ট দালাল ও হয়রানিমুক্ত করার জোর দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।
.png)
নেয়া হয় না জোরালো ব্যবস্থা:
চেকপোস্টে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দালালদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। কোনো অভিযান বা শাস্তি না থাকায় তাদের থামানোর আর কেউ থাকে না। ফলে দালাল চক্র দিন দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় যাত্রীরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দর্শনা আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দালালমুক্ত করার জন্য জোর দাবি জানান। যদিও দর্শনা আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন ইনচার্জ আতিক হাসান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ছিনিয়ে নেয়া হয় যাত্রীদের মালামাল:
অভিযোগ রয়েছে, ভারতগামী ও ভারত থেকে ফেরা প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে দালাল চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে ২শ' টাকা থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। কোনো যাত্রী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার পাসপোর্ট আটকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করে থাকে দালাল চক্রের সদস্যরা। এছাড়া দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ভারত ফেরত যাত্রীদের কাছ থেকে মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। এক কথায়, দর্শনা আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াতকারী যাত্রীরা বর্তমানে দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক সূত্র এসব বিষয় জানিয়েছে।
টাকা দিতে বাধ্য করা হয় যাত্রী নিপাকে:
রাজশাহী শহরের নিপা খাতুন তার অসুস্থ স্বামীকে চিকিৎসার জন্য দর্শনা স্থলপথ দিয়ে ভারতে নিয়ে যান গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। ঐদিন দর্শনা চেকপোস্টে দুলাল নামে এক দালাল তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। নিপা তার স্বামীর চিকিৎসা শেষে গত ৬ মার্চ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ভারত থেকে দর্শনা আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে পৌঁছান। এরপর দুলাল নামে ঐ দালাল নিপার কাছ থেকে জোর করে পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। দ্রুত ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ সম্পন্ন করার নাম করে তার কাছে ৫০০ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দুলাল তার পাসপোর্ট আটকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখায়। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে নিপা ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য হন। এরপর ওই যাত্রী দ্রুত দর্শনা রেলস্টেশনে গিয়ে সাগরদাঁড়ি ট্রেনযোগে নিজবাড়ি রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হন।

টাকা ছাড়া পার পাননি যাত্রী লিয়াকত আলী:
দর্শনা স্থলপথ দিয় নিয়মিত ভারতে যান জীবননগর পৌর শহরে বসবাসকারী লিয়াকত আলী (ছদ্মনাম)। চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে লিয়াকত গত সপ্তায় দর্শনা চেকপোস্ট হয়ে বাড়ি ফেরেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভারতে যাওয়ার দিন এবং ফেরার দিন দুলাল নামে এক দালাল আমার কাছ থেকে জোর করে ২শ' টাকা করে নিয়েছে। এখানে দালাল চক্র এতই শক্তিশালী যে, তাদের মাধ্যমে ছাড়া কোনোভাবেই ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।
প্রতক্ষ্যদর্শীরা যা বলছেন:
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দর্শনা চেকপোস্টে চলাচলকারী এক ভ্যানচালক বলেন, আমি দর্শনা বাসস্ট্যান্ড থেকে চেকপোস্টে নিয়মিত ভারতগামী যাত্রী আনা-নেয়া করে থাকি। দর্শনা বাসস্ট্যান্ড অথবা রেলস্টেশন থেকে যাত্রী এনে দর্শনা চেকপোস্টে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই দালাল চক্রের সদস্যরা যাত্রীর কাছ থেকে জোর করে পাসপোর্ট কেড়ে নেয়।
তিনি আরো বলেন, এরপর ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস অফিসের কাজ সম্পন্ন করার নাম করে প্রতি যাত্রীর কাছে ২শ' টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে। টাকা না দিলে তাদেরকে বিভিন্ন অজুহাতে দুর্ব্যবহারসহ হয়রানি করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভারত যাত্রীর কাছ থেকে মালামালও কেড়ে নেয় দালাল চক্রের সদস্যরা। দর্শনা চেকপোস্ট দালালমুক্ত করা না হলে এই পথ দিয়ে ভারতে যাতায়াতকারী যাত্রী অনেক কমে যাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দর্শনা চেকপোস্ট এলাকার এক দোকানি বলেন, চেকপোস্টে দালালদের দৌরাত্ম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। এদের পেছনে ক্ষমতাধর অনেকেই আছে। ভারতে যাতায়াতকারী যাত্রীরা এ চক্রের কাছে কাছে একেবারে অসহায়। কোনো যাত্রী অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। ফলে অনেক যাত্রী হয়রানি এড়াতে দালাল চক্রের অন্যায় দাবি মানতে বাধ্য হন।
আলোচনায় যেসব দালাল:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশ কয়েকজন দালাল দর্শনা আন্তর্জাতিক চেকপোস্টকে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া ও প্রভাশালী কয়েকজন হলো- জাহাঙ্গীর, লিটন মিয়া, দুলাল, সামাদ, লালু, আনোয়ার, তমেজ, সাহেব আলী, লিপু, অশোক, আলাল ও মাকাল। এই দালালরা আবার বিভিন্ন পণ্য ও মাদক অবৈধ পথে ভারত-বাংলাদেশে পাচার করে থাকে। অবৈধ টাকায় এসব দালালের অনেকেই এলাকার প্রভাবশালী অর্থবিত্তের তালিকায় নাম লিখিয়েছে।
দর্শনার এই স্থলপথ দিয়ে চিকিৎসা, ভ্রমণ, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন গড়ে এক থেক দেড় হাজার যাত্রী ভারতে যাতায়াত করেন। এ পথে ভারত গমন বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। প্রশাসনও এই চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। এ সুযোগে দালাল চক্রের সদস্যরা ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নামে যাত্রীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। যেসব যাত্রী টাকা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন, তাদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় দালাল চক্রের সদস্যদের হাতে।
সরেজমিন যা দেখা যায়:
গত ৯ মার্চ দুপুরে সরেজমিন দর্শনা চেকপোস্টে দেখা গেছে, ভারতগামী যাত্রী চেকপোস্টে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দালাল চক্রের সদস্যরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কে আগে যাত্রীর পাসপোর্ট হাতিয়ে নিতে পারে। আবার অনেক যাত্রী এসব ঝামেলা এড়াতে আগে থেকেই দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চেকপোস্টে আসে।
পাসপোর্ট হাতে নিয়ে দালালরা ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নাম করে যাত্রীর আর্থিক অবস্থা অনুমান করে ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা
পর্যন্ত আদায় করে।
ভুক্তভোগী অনেক যাত্রী দর্শনা আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দালালমুক্ত করার জন্য চেকপোস্টে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তবে এ বিষয়ে কোনো যাত্রী এখন পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত কোনো অভিযোগ করেননি।
যা বলছে প্রশাসন:
এদিকে, দর্শনা আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশনের ইনচার্জ আতিক হাসান সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, আমাদের কাছে কোনো যাত্রী এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেনি। কোনো যাত্রী কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন দালাল মুক্ত রাখতে যাত্রী ছাড়া বহিরাগত কাউকে ইমিগ্রেশন এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হয় না। আমরা ইমিগ্রেশন দালাল মুক্ত রাখার জন্য আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করি। কোনো দালাল না ধরে সরাসরি ইমিগ্রেশনে আসার জন্য যাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান এই কর্মকর্তা।