ঈদ যাত্রায় কথিত ১৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কল্পিত অভিযোগ: মানুষের আবেগ নিয়ে ভয়ংকর খেলা
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সরকার, সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সপ্তখানেক ধরে তৎপর রয়েছে। দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে রয়েছে নতুন ক্ষমতাসীন সরকার এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এর মাঝে 'যাত্রী কল্যাণ সমিতি' নামে ভুঁইফোঁড় ভুয়া সংগঠন ঈদযাত্রায় মানুষ হয়রানীর ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে বলে প্রচার করে নির্লজ্জভাবে সরকার এবং সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানবেতর পরিশ্রম প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বুধবার যাত্রী কল্যাণ সমিতি স্বাক্ষরবিহীন এক প্রেস রিলিজ এবং কিছু সাংবাদিককে ডেকে আপ্যায়নের মাধ্যমে ২০ বছরের ইতিহাস ভঙ্গের গান শুনিয়েছে। এতে ছিল না কোনো তথ্য উপাত্ত বা কিসের ভিত্তিতে এ ধরনের দাবি করা হচ্ছে তার গবেষণা নথিপত্র। আদতে এ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের এ ধরনের গবেষণা করার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মানসিক দক্ষতা রয়েছে কিনা তাও প্রশ্নবিদ্ধ।
তাদের ভাষ্যমতে, আগে যেখানে ৪০০-৫০০ টাকা ভাড়া ছিল এখন তা ১২০০-১৫০০ টাকা। কিন্তু এ ধরনের কোনো ভুক্তভোগী যাত্রীর নাম ঠিকানা কিংবা সময়কাল উপস্থাপন করতে পারেনি। তারা এও বলেনি, তাদের কাছে নাম ঠিকানা রয়েছে। গোপনীয়তার কারণে প্রচার করছে না।
.png)
বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা যখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে তারা কখনো দাবি অস্বীকার করছে আবার কখনো টেলিফোন কেটে দিচ্ছে। আবার অনেক সময় বলে যে প্রতিবছরই তারা এ হলো বিবৃতি দিচ্ছে কেউ তো কিছু বলে না। একি মগের মুল্লুক- যা ইচ্ছা তাই বলে দিবে!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা থেকে একটি জেলার নির্ধারিত ভাড়া ৬০০ টাকা। প্রচলিত সময়ে যাত্রী কম থাকায় তারা কিছুটা কমিয়ে ৪৫০ বা ৫০০ টাকার মধ্যে যায়। এই বাসের সর্বশেষ গন্তব্যে নির্ধারিত ভাড়া ১০০০ টাকা; এসি বাস ভাড়া ১৪০০ টাকা। ঈদযাত্রায় মাঝ পর্যায়ের গন্তব্যগুলোতে সীমিত টিকিট রেখে সর্বশেষ গন্তব্যের টিকিট মাঝ পর্যায়ের গন্তব্যের যাত্রীদের কাছে বন্ধ রাখছে। অনেকক্ষেত্রে যাত্রীরা আগে যাওয়ার জন্য সর্বশেষ গন্তব্যের টিকিট কাটছে (যেমন বগুড়ার যাত্রী ঠাকুরগাঁও বা পঞ্চগড়ের টিকিট কাটছে; রাজবাড়ীর যাত্রী কুষ্টিয়ার টিকিট কাটছে)। ফলে, যাত্রীরা হয়তো পূর্বের প্রচলিত ৪০০-৪৫০ টাকার টিকিট চাহিদা বেশি হওয়ায় বিআরটিএ নির্ধারিত ৬০০ টাকায় কিনছে। অনেকক্ষেত্রে, দ্রুত যেতে ৮০০-১০০০ টাকার পরবর্তী বা সর্বশেষ গন্তব্যের টিকিট কিনছে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গন্তব্যের বাসের সিট যথেষ্ট নয় বা কম থাকলেও পরবর্তী গন্তব্যের ভাড়া দিয়ে নিকটস্থ গন্তব্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যাত্রী নিজেই নিচ্ছে।
এ হলো বিষয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মনগড়া সংবাদ প্রচার করে সরকার ও সচেতন মানুষকে বিব্রত করার পাশাপাশি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ।
উল্লেখ্য যে, ঈদযাত্রায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মলমপার্টি, যাত্রী হয়রানি এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, পুলিশ এবং মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে ঢাকা মহানগরীর গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রতিটি টার্মিনালে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, বিআরটিএ ও ভোক্তা অধিকারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মনিটরিং ক্যাম্প বসানো হয়েছে। এছাড়া বিশৃঙ্খলা এড়াতে মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
টার্মিনালগুলোতে কোনো যাত্রীর কাছ থেকেই অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হয়নি বলে দাবি করেছে মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ। পাশাপাশি জানানো হয়েছে, কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর প্রমাণস্বরূপ, অনিয়ম করার অপরাধে এরই মধ্যে একজন বাস কাউন্টার ম্যানেজারকে গ্রেফতার করে সাজাও দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাফল্যের মাঝেই 'বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি'-এর জনৈক মোজাম্মেল হক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রচার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৪৮ কোটি টাকার বাড়তি ভাড়া আদায়ের যে চটকদার সংবাদটি প্রচার করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ব্যক্তিগত প্রচার পাওয়ার লোভে তৈরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মালিক সমিতির মতে, সরকার, প্রশাসন ও পরিবহন খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্যই এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সংগঠনটি মূলত একটি 'কাগজে-কলমে ভুঁইফোঁড় সংগঠন', যাদের বাস্তবে কোনো জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই।
এই ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এই মনগড়া সংবাদের ব্যাখ্যা দাবি করে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব রুখতে মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন।
ঈদের মতো একটি সংবেদনশীল সময়ে এমন অসত্য খবর প্রচারের ফলে ঈদ ম্যানেজমেন্টের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মিথ্যা সংবাদগুলো পরিবহন মালিকদের পাশাপাশি খোদ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশেষ সময়ে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর খবর প্রচারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তদন্ত করে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।