ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ কৃষি ও প্রকৃতি ]

আবাদি জমিতে পুকুর কাটার হিড়িক

এম.এম আরিফুল ইসলাম, নাটোর
প্রকাশিত: ১৩:০২, ১৭ এপ্রিল ২০১৮
আবাদি জমিতে পুকুর কাটার হিড়িক
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলের শস্য ভাণ্ডারখ্যাত নাটোর জেলায় মাছ চাষ লাভজনক হওয়ায় জেলার ৭টি উপজেলাতেই পড়েছে পুকুর কাটার হিড়িক। আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন করায় কমছে আবাদী জমি। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। চাষাবাদের হচ্ছে ব্যাপক ক্ষতি।

অপরদিকে রাস্তার ওপর দিয়ে মাটি বহনের ফলে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে প্রায়ই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার না পাওয়ায় বিক্ষুদ্ধ জনতা পুড়িয়ে দিয়েছে মাটি খননের কাজে ব্যবহৃত এস্কোভেটরি মেশিন (ভেকু)। তারপরেও স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।

কৃষি বিভাগের হিসেব মতে বিগত ৪ চার বছরে জেলায় আবাদি জমি কমেছে ৬৪৮৭ হেক্টরে। তিন ফসলি ও চার ফসলি এসব আবাদি জমি এমন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাটোরের জেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এভাবে চলছে থাকলে খাদ্যউদ্বৃত নাটোর জেলায় অচিরেই দেখা দেবে খাদ্যের সংকট। তবে কি পরিমান পুকুর বাড়ছে সেই হিসেব নেই কৃষি বিভাগ বা মৎস বিভাগের কাছে।

Advertisement

গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের দুর্গাপুর-বাবলাতলা গ্রামের কৃষক হারু প্রামাণিক, সাহাদ, শামীম ও শীতলের প্রায় ১০ বিঘা জমি স্বল্প মূল্যে লিজ নিয়েছেন একই গ্রামের বাসিন্দা বদর আলী। হাঁড়িভাঙ্গা বিলের লিজ নেয়া সেই জমিতেই শুরু করেন পুকুর খনন। পাশের ৯ বিঘা জমিতে আরেকটি পুকুর খনন চলছে। হাঁড়িসভাঙ্গা বিলে জমি আছে এমন অন্তত ১৫ জন কৃষক বলেন, বিল এলাকায় কমপক্ষে ২০টি পুকুর খনন করা হয়েছে। আরো ১০টি পুকুর খননের কাজ চলছে। এর মধ্যে ফিরোজ হোসেন তালুকদারের ১৪ বিঘা ও ছয় বিঘা আয়তনের দুটি, নজরুল ইসলামের ১২ বিঘা, ফজলুর রহমানের ১২ বিঘা, মিজানুর রহমান তালুকদারের ১০ বিঘা জমির পুরোটা পুকুর করা হচ্ছে। অন্য প্রভাবশালী জমির মালিকেরাও পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন।
বিলে পুকুর খনন বন্ধের দাবিতে স্থানীয় জমির শতাধিক মালিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন আক্তার বলেন, কৃষি জমিতে পুকুর খননের সুযোগ নেই। কেউ পুকুর করতে চাইলে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যেতে পারে। হাঁড়িভাঙ্গা বিলে পুকুর খননকারীরা সেই নিয়ম অনুসরণ করেননি। তিনি কৃষকদের লিখিত অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এর সত্যতা পেয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি পুকুর খনন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, কৃষিজমিতে পুকুর খনন বন্ধে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।

লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নজরুল ইসলাম বলেন, আবাদি জমিতে পুকুর খনন কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আবাদি জমিতে পুকুর খনন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বড়াইগ্রাম উপজেলাতেও চলছে অনুমোদনহীন পুকুর খনন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে প্রতিকার পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। ভবানীপুর গ্রামেও একই অবস্থা। অনুমোদন না নিয়েই চলছে পুকুর খনন। এ ছাড়া নাটোর সদর উপজেলার আগদিঘা, মাঝদিঘা, মির্জাপুর দিঘা শংকরভাগ, পিপরুল, বাশভাগ, সেনভাগ, শ্যামনগর লক্ষীকোলসহ বিভিন্ন স্থানে চলছে পুকুর খনন।

নাটোরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, নাটোরের মত উর্বর এবং তিন-চার ফসলি এমন জমি দেশে আছে।

নাটোর জেলাতে ২০১৩-১৪ মৌসুমে নাটোরে আবাদি জমির পরিমান ছিল ১,৫৩,৬৭৪ হেক্টর, ২০১৪-১৫ ১,৫০,৮৩৮ হেক্টর, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ১,৪৮,৭৪৩ চলতি মৌসুম ২০১৬-১৭ তা কমে দাড়িয়েছে ১,৪৭,১৮৭ হেক্টর জমিতে।

নাটোরের জেলা মৎস কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা ও নলডাঙ্গ উপজেলা মৎস অফিসার মো ইব্রাহিম হামিদ শাহিন বলেন, মাছ চাষকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। তবে তা পরিকল্পিত এবং আইন মেনে হতে হবে। নাটোরে যেভাবে অপরিকল্পিত পুকুর খনন হচ্ছে তাতে মাছ চাষের যেমন ক্ষতি হচ্ছে একইভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে যাতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, আবাদি জমি কমে গেলে তাদের মানুষের জীবন সংকটাপন্ন হবে। আবাদি জমি রক্ষা করার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছেন বলে জানান তিনি।

শাহিনা খাতুন আরো বলেন, ফসলি জমিতে পুকুর খনন বা শিল্পায়ন কঠোর হাতে দমন করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ/এমআরকে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!